

সমুদ্র আর সবুজ পাহাড়ে ঘেরা কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়ন এক সময় ছিল বন ও পাহাড়নির্ভর জীবিকার নিরিবিলি এক জনপদ। জেলেরা সাগরে জাল ফেলতেন, কৃষকেরা পাহাড়ের ঢালে ফসল ফলাতেন, সন্ধ্যা নামলে ঘরে ঘরে জ্বলত রান্নার আগুন। সেই শান্তির দিন এখন কেবল স্মৃতি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অপহরণ ও মানব পাচারের এক ভয়ংকর নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের ভেতরে গোপন আস্তানায় মানুষকে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়, আর সুযোগ পেলে সাগর পথে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় পাচার- এটাই এখন এই অঞ্চলের নির্মম বাস্তবতা।
সম্প্রতি বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার এবং আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ৯ জন জীবিত উদ্ধার ও বহু নিখোঁজের ঘটনা সেই বাস্তবতাকে আবারও ভয়াবহভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
স্বজন হারানোর আশঙ্কায় ভেঙে পড়ছে পরিবারগুলো। অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে পাহাড়ি-উপকূলের প্রায় ১০ হাজার মানুষ। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গতকাল বুধবার সকাল থেকে অপহরণ ও মানব পাচার দমনে পাহাড়ি এলাকায় যৌথ অভিযান শুরু করেছে নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
দক্ষিণ বাহারছড়ার পাহাড়ঘেরা একটি এলাকায় একটি মুদি দোকানে জমিসংক্রান্ত সালিশ শেষে বসে ছিলেন ৮-১০ জন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা। সবার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই- অপহরণ ও মানব পাচারের ক্রমবর্ধমান বিস্তার।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল আজিজ বলেন, এখানে এখন শুধু ভয়। সন্ধ্যা নামলেই আমরা সন্তানদের বাইরে যেতে দিই না। কখন কাকে ধরে নিয়ে যায়, কেউ জানে না।
তিনি জানান, অনেকেই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রায় প্রতিদিনই অপহরণের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কমে যাওয়ায় এসব ঘটনা আরও বেড়েছে বলে তার অভিমত।
মুদি দোকানি জালাল উদ্দিন বলেন, সন্ধ্যার পর এখানে চলাফেরা করা কঠিন। কখন কাকে ধরে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করবে বলা মুশকিল। আবার মুক্তিপণ না পেলে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তারা পাচার করে দেয় সাগর পথে।
পাহাড়ের অন্ধকার আস্তানা থেকে ফিরে আসা মানুষের বিবরণ শুনলে গা শিউরে ওঠে। সম্প্রতি একটি মানব পাচারকারীর আস্তানা থেকে ফিরে আসা নুর আলম বলেন, চোখ খুলে দেখি চারপাশে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ বন্দি। প্রতিদিনই চলে নির্যাতন।
তিনি জানান, তার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অত্যাচার করা হয়। অন্যদের ক্ষেত্রেও একইভাবে পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে নির্যাতনের শব্দ শুনিয়ে টাকা দাবি করা হয়।
নুর আলম বলেন, টাকা না পেলে তাদের মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। যেদিন পালিয়ে আসি, সেদিনও আরও কয়েকজন আটক ছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, মানব পাচার ও অপহরণ কার্যত একই অপরাধচক্রের দুটি মুখ। উপকূলজুড়ে সক্রিয় এই নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে প্রলোভন, জোর-জবরদস্তি ও অপহরণের মাধ্যমে সাগর পথে পাচার করে আসছে। পরিসংখ্যান চমকে দেওয়ার মতো। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী অন্তত তিন হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। এ সময়ের মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ১১৫টি মামলায় প্রায় এক হাজার ১০০ জনকে আসামি করা হয় এবং ৬০০ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতেও বড় ঘটনা ঘটেছে। গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপে মালয়েশিয়া পাচারের সময় নারী-শিশুসহ ২৬৩ জনকে উদ্ধার এবং ১০ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়।
অপহরণের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। গত তিন বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই ৯৫টি ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন অপহৃত হন, যাদের মধ্যে ৮৬ জন রোহিঙ্গা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন। অপহরণের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে টেকনাফ সদর, হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম।
বাহারছড়া ও কচ্ছপিয়া ঘুরে জেলে, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে অপহরণ ও মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্র মিলেছে।
তাদের মতে, এসব অপরাধের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ- মাদক ও পণ্যের চোরাচালান, মানব পাচার চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়হীনতা।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম নজরুল বলেন, অপহরণ ও মানব পাচার একই সূত্রে গাঁথা। শক্তিশালী এই চক্র ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জরুরি। ২০১৫ সালের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে।
বাহারছড়ার ইউপি সদস্য ফরিদ উল্লাহ জানান, অপহরণ ও মানব পাচার বেড়ে যাওয়ায় সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চৌকি স্থাপন জরুরি। পাচারকারীদের তালিকা পুলিশের কাছে আছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে মাছ ধরার নৌযানগুলো নিবন্ধন ও চিহ্নিত করার দাবিও জানান তিনি, কারণ এসব নৌযানই পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি পর্যটকদের সতর্ক করে বলেন, মেরিন ড্রাইভে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একা চলাচল থেকে বিরত থাকা উচিত। শীলখালী, বড়ডেইল, গর্জন বাগান, বাঘঘোনা ও কচ্ছপিয়া এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) রকিবুল হাসান জানান, নৌবাহিনীসহ যৌথ বাহিনী বাহারছড়াসহ পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানাগুলোতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল বুধবার অভিযানে কয়েকটি অপহরণ ও মানব পাচারকারীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার শীলখালী বাহারছড়া এলাকায় পাহাড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন জানিয়ে তিনি বলেন, অপহরণ-মানব পাচারে জড়িতদের দ্রুত আইনের মুখোমুখি করা হবে।
মন্তব্য করুন