সোমবার
১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আসামি পলাতক, পরিবারের চার সদস্যকে কারাগারে পাঠাল পুলিশ

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ  ও এক শিশু
expand
৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ও এক শিশু

কক্সবাজারের উখিয়ায় এক আসামির পলায়নকে কেন্দ্র করে তার পরিবারের ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা, দুই নারী ও মায়ের সঙ্গে এক শিশুকে আটক করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় এলাকায় তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে; অনেকেই এটিকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিকতা ও বিচারবোধের ঘাটতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আটক ব্যক্তিরা স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সালাহউদ্দিন মেম্বারের পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার পিতা জাফর আলম (৮০), স্ত্রী, ভাইয়ের স্ত্রী এবং প্রায় আট বছর বয়সী এক ভাতিজি- মাইরা মনি।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, শনিবার দিবাগত রাতে সালাহউদ্দিন মেম্বারের বাড়ি ঘেরাও করে পুলিশ তার ছোট ভাই মিজানকে আটক করে। তবে একপর্যায়ে হাতকড়া পরা অবস্থায় তিনি পালিয়ে যান। এই ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

পুলিশের দাবি, এ ঘটনায় ‘পুলিশের ওপর হামলা’ অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় ১৫ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরে আটক চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে একজন বৃদ্ধ, দুই নারী ও একটি শিশুকে এ ধরনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আটক করার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তাদের প্রশ্ন, একজন পলাতক ব্যক্তির দায় কীভাবে তার পরিবারের ওপর বর্তায়? বিশেষ করে শিশুটিকে মায়ের সঙ্গে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি মানবিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা যৌক্তিক- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে এ ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন রামিম এক ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ৯ বছরের নিচে কোনো শিশুর কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। সেই বিবেচনায় একটি শিশুকে গ্রেপ্তার করা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

উখিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক সাইদ মোহাম্মদ আনোয়ারও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুকে থানায় আটক রেখে পরে আদালতে পাঠানো শুধু আইনের পরিপন্থী নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও মারাত্মক অবমাননা।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, ৯ বছরের নিচে কোনো শিশুকে ফৌজদারি অপরাধে দায়ী করা যায় না। সেই প্রেক্ষাপটে একটি শিশুকে মামলার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা বা আটক রাখা আইনগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়।

তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিক দিক ও মৌলিক নীতিগুলো অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া-টেকনাফ সার্কেল) রকিবুল হাসান বলেন, ছয় মাসের সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামিকে ধরতে গেলে তিনি হাতকড়াসহ পালিয়ে যান।

এ সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় দুই নারী ও একজন বৃদ্ধকে আটক করা হয়েছে। পরিবারের অনুরোধে শিশুটিকে তার মায়ের সঙ্গে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালত নেবে। ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিকতা, বিচারবোধ এবং প্রাসঙ্গিক আইনি সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাদের দাবি, ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন