বৃহস্পতিবার
১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদ এলেও খুলল না রাখাইনের পথ, উল্টো বাড়ল অনুপ্রবেশ

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০২:১৬ পিএম আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০২:১৭ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি এবং বড় প্রতিশ্রুতি আমাদের মনে বিশ্বাস জাগিয়েছিল দুঃসহ এই শিবিরজীবনের হয়তো অবসান হতে যাচ্ছে। কিন্তু এক বছর পর এসে সেই আশার জায়গা দখল করেছে গভীর হতাশা। আমরা ভেবেছিলাম, এবার সত্যিই ফিরব। কিন্তু এখন দেখি, সবকিছু আগের মতোই আছে। এখনো সেই ঘোষণার দিনটির কথা ভুলতে না পেরে আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রিয়াজ

জানা গেছে, এক বছর আগে ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন আন্তোনিও গুতেরেস। তার সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেদিন শিবিরে উপস্থিত লাখো রোহিঙ্গার সামনে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল ২০২৬ সালের ঈদ হয়তো তারা উদযাপন করবে নিজ ভূমি মিয়ানমারে, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে, আপনজনের কবর জিয়ারত করে।

এই ঘোষণায় শিবিরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আশার আলো। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা আর মানবিক সংকটে ক্লান্ত মানুষগুলো নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, ক্যালেন্ডারে আবার ঈদ চলে এসেছে। গত এক বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরেনি মিয়ানমারে।

বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গত ১৫ মাসে নতুন করে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যাবাসনের বদলে উল্টো অনুপ্রবেশই বেড়েছে। কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে এখন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে, যেখানে প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তা, সংকট আর ভবিষ্যতহীনতার মধ্যে।

রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নির্ভর করে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর- বিশেষ করে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার ওপর। এসব নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো প্রত্যাবাসনই টেকসই হবে না। অতীতেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একই কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই জটিলতা আরও বেড়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। সরকারি বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান লড়াই পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তো দূরের কথা, টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমার এখনো প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত নয়- না অবকাঠামোগতভাবে, না রাজনৈতিকভাবে। ফলে আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তা এগোচ্ছে না।

অন্যদিকে শরণার্থী শিবিরের ভেতরের পরিস্থিতিও দিন দিন নাজুক হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার আগের তুলনায় কম রেশন পাচ্ছে। জ্বালানি সংকটও বাড়ছে, যা দৈনন্দিন জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ তৈরি করছে। এসব সংকটের প্রভাব পড়ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও, যা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাম্প-১৮- এর বাসিন্দা আব্দুল হাইয়ের কাছে ফিরে যাওয়া কোনো কূটনৈতিক শব্দ নয়- এটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। ২০১৭ সালের সহিংসতার সময় প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা এই মানুষটি এখনো অপেক্ষা করছেন এমন এক দিনের, যেদিন তিনি নিজের ভিটেমাটিতে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন। তিনি বলেন, আমাদের সবকিছু ওখানেই। আমরা শুধু নিরাপদে ফিরতে চাই।

ক্যাম্প ১৪ এর নাজিম উদ্দিন বলেন, বিশ্বনেতাদের আশ্বাসে আমরা দিন গুনছিলাম- কবে ফিরব, কবে আবার নিজের ঘরে উঠব। কিন্তু এখন বুঝি তারা সেদিন মিথ্যা গল্প শুনিয়েছিলো। শিবিরের এই জীবনই যেন আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে।

একই ক্যাম্পের সোয়াইব উল্লাহ বলেন, আমার সন্তানেরা শুধু গল্পে তাদের গ্রামের কথা জানে। আমি ভাবতাম, এবার হয়তো তাদের নিয়ে নিজের ভিটায় দাঁড়াতে পারব। কিন্তু সেই স্বপ্নটা এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবারই বলা হয়- ফেরানো হবে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে যায়, আমরা শুধু অপেক্ষাই করি।

অধিকাংশ রোহিঙ্গারা বলছেন, একসময় ভেবেছিলাম, কয়েক মাসের জন্য এসেছি। এখন ৯ বছর পার হয়ে গেছে, জীবনটাই এখানে আটকে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন আর শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সংকট। এর সমাধানের জন্য প্রয়োজন কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ, আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন। শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন