


কক্সবাজারের পেকুয়া ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাগরপথের মানবপাচার চক্র। থাইল্যান্ড–ইন্দোনেশিয়া ঘুরিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় নারী-পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকির পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে—এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় মাসে অন্তত তিন শতাধিক নারী-পুরুষকে এ রুটে পাচার করা হয়েছে। এর পেছনে কাজ করছে একাধিক স্তরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার শিকড় পেকুয়া, বাঁশখালী, চকরিয়া ও টেকনাফ থেকে বিদেশে অবস্থানরত দালাল চক্র পর্যন্ত বিস্তৃত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিদেশে চাকরি, উন্নত জীবন এবং দ্রুত মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। এরপর অল্প অগ্রিম নিয়ে আগ্রহীদের টেকনাফ উপকূলে পাঠানো হয়। সাগরে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ট্রলার বা নৌকায় তুলে তাদের আন্তর্জাতিক পাচার রুটে সক্রিয় আরেক দফা দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সীমান্তঘেঁষা ট্রানজিট পয়েন্টে পৌঁছানোর পর শুরু হয় পরিবারের ওপর নতুন করে অর্থ আদায়ের চাপ। টাকা না দিলে অনিশ্চিত পরিণতি, আর টাকা দিলেও শেষ গন্তব্য সবার ভাগ্যে জোটে না।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়নের কেরুণছড়ি এলাকার আবুল হোসেনকে কেন্দ্র করে একটি মানবপাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের মূল সমন্বয়ক হিসেবে নাম এসেছে তার মেয়ের জামাই, চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের বাসিন্দা মালয়েশিয়া প্রবাসী হাবিবুর রহমানের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় গাড়িচালক হিসেবে কাজ করা হাবিবুর রহমান প্রায় ২৩ মাস আগে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে গিয়ে টেকনাফ–চকরিয়াভিত্তিক একটি পাচারচক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়।
প্রথমে অন্যদের মাধ্যমে লোক পাঠালেও গত কয়েক মাসে তিনি নিজেই সরাসরি এই নেটওয়ার্ক পরিচালনার দায়িত্ব নেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হাবিবুর রহমান বিদেশে থাকাকালে দেশের ভেতরে লোক সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনের দায়িত্ব পালন করতেন তার শ্বশুর আবুল হোসেন ও স্ত্রী হাসিনা বেগম।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে তিনি দেশে অবস্থান করে পেকুয়া ও বাঁশখালীর অসহায় নারী-পুরুষদের নতুন করে টার্গেট করছেন এবং বড় একটি মানবপাচার চালান প্রস্তুত করছেন।
চক্রটির কৌশলও বেশ সুসংগঠিত। প্রথমে জনপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়।
এরপর পেকুয়া, টৈটং, রাজাখালী, মহেশখালী ও বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে মাইক্রোবাস বা হাইএসে করে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সুবিধাজনক সময়ে সাগরে আগে থেকেই অবস্থানরত নৌযানে তোলা হয় তাদের। অভিযোগ আছে, টেকনাফের কথিত জাফরসহ কয়েকজন মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারী এই অংশটি দেখভাল করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় টাকা দাবি। জনপ্রতি সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা না দিলে যাত্রীদের আটকে রাখা, নির্যাতন কিংবা অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টাকা আদায়ের পর তাদের মালয়েশিয়াগামী পরবর্তী দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কেউ গন্তব্যে পৌঁছালেও অনেকেই মাঝপথে নিখোঁজ, আটক বা মৃত্যুর মুখে পড়েন।
এই সিন্ডিকেটের আর্থিক লেনদেন নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। পাচার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে কমিশন কেটে তা ব্যাংকিং চ্যানেল বা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে থাকা দালালদের কাছে পাঠানো হয়। এ কাজে আবুল হোসেন ও তার মেয়ে হাসিনা বেগম সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে মালয়েশিয়া যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে সরাসরি যোগাযোগ করলে আবুল হোসেন পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তার সেই বক্তব্য রেকর্ডে সংরক্ষিত রয়েছে।
তিনি স্বীকার করেন, লোকজনকে টেকনাফ–উখিয়ার উপকূলে আগে থেকে প্রস্তুত নৌযানে তুলে দেওয়া হয় এবং বাকি সমন্বয় করেন তার জামাই হাবিবুর রহমান। টাকা গ্রহণ করেন তিনি এবং তার মেয়ে।
অনুসন্ধানে আরও একটি নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া গেছে। টৈটংয়ের গুধিকাটা এলাকার আবু তাহেরের ছেলে বত এবং তার স্বজন বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার ফোরকানকে ঘিরে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, বত মালয়েশিয়ায় বসে নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন। আর দেশে অবস্থানরত তার স্ত্রী ও ছনুয়ার ফোরকান লোক সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বতের স্ত্রী পেকুয়ার টৈটং, রাজাখালী ও মহেশখালী এলাকা থেকে নারী-পুরুষ সংগ্রহ এবং অর্থ আদায়ে জড়িত।
এই চক্রও গত দেড় মাসে শতাধিক মানুষকে সাগরপথে পাঠিয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে তথ্য মিলেছে।
পেকুয়ার টৈটংয়ের খুনিয়া ভিটা এলাকার মনুর ছেলে আনসারের বিরুদ্ধেও সরাসরি লোক সংগ্রহ ও সাগরপথে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, তিনি কমিশনভিত্তিক লোক নিয়োগ দিয়ে পেকুয়া–বাঁশখালী এলাকায় প্রচার চালান এবং বিদেশ যেতে আগ্রহীদের সংগ্রহ করেন। তার মাধ্যমে অন্তত ৫০ জনের বেশি নারী-পুরুষ পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার শফির নামও এসেছে। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিও আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ।
পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করা হলে তিনি মালয়েশিয়া যাওয়ার বিষয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান।
এছাড়া টৈটং চেপ্টামুরার এক মালয়েশিয়া প্রবাসীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে—তিনি অবৈধ পথে যাওয়া লোকজনকে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রহণ করে পরবর্তী গন্তব্যে পাঠানোর কাজ করেন।
আবুল হোসেনের সূত্র ধরে হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে বিদেশ থেকে আরেক ব্যক্তি ফোন দিয়ে কেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে তা জানতে চান। মানবপাচারের অভিযোগের কথা জানানো হলে তিনিও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
মন্তব্য করুন