

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


পিতৃপরিচয় আর বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশ চেয়েছিলেন কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত (২৩)। সেই দাবি জানাতে গিয়ে পেকুয়া থানায় হাজির হন তিনি ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানু। কিন্তু থানায় যাওয়ার সেই পথই তাদের জন্য হয়ে ওঠে দুর্ভোগের।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা এবং কয়েক দিনের কারাবাস- সবকিছুর পর শেষ পর্যন্ত আদালত তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম মা ও মেয়েকে খালাসের আদেশ দেন। পরে বিকেলে সেই আদেশ জেলা কারাগারে পৌঁছালে সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পান।
জুবাইদা জন্নাত কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাবেক গুলদি এলাকার বাসিন্দা মৃত নুরুল আবছার ও রেহেনা মোস্তফা রানু দম্পতির মেয়ে। জুবাইদার বয়স যখন প্রায় এক বছর, তখন তার বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
পরিবারটির অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের জেরেই সেই বিচ্ছেদ ঘটেছিল।
বিচ্ছেদের পর ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন রেহেনা মোস্তফা রানু। অন্যদিকে নুরুল আবছার দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। পরে রেহেনাও নতুন করে সংসার শুরু করেন। সেই সংসারে রুবেল নামের আরেক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সীমিত আয়ের মধ্যেও ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি।
২০১৩ সালের ২৩ মে নুরুল আবছারের মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে দাবি তোলেন জুবাইদা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাবার পরিবারের সদস্যরা তাকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি ও সম্পত্তির অধিকার পেতে জুবাইদা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে ওয়ারিশ সনদের জন্য আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও তাকে সেই সনদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জুবাইদাদের দাবি, সনদ দিতে বাধা দেন স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য বিজু, যিনি সম্পর্কে জুবাইদার ফুফু। তাদের পৈতৃক বাড়ি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।
ওয়ারিশ সনদ না পেয়ে বাবার সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
অভিযোগ উঠেছে, প্রায় এক বছর পার হলেও এসিল্যান্ড কার্যালয় সেই প্রতিবেদন জমা দেয়নি। পরে জুবাইদা আদালতে আবেদন করে তদন্তের দায়িত্ব পরিবর্তনের অনুরোধ জানান। সেই আবেদনের পর আদালত পেকুয়া থানাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
ঘুষের অভিযোগ ও থানায় ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পান পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে তিনি ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। জুবাইদার খালা নিজের স্বর্ণের আংটি বন্ধক রেখে সেই টাকা দেন বলেও দাবি পরিবারের। টাকা দেওয়ার পরও তদন্ত প্রতিবেদন জুবাইদার বিপক্ষে দেওয়া হয়।
এরপর গত বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) জুবাইদা তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে নিয়ে থানায় যান। সেখানে এসআই পল্লব কুমার ঘোষের কাছে জানতে চান কেন তাকে বঞ্চিত করা হলো এবং ঘুষ হিসেবে দেওয়া টাকা ফেরত চান।
পরিবারটির অভিযোগ, টাকা ফেরত চাইতেই পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়। নারী পুলিশ দিয়ে মা ও মেয়েকে মারধর করা হয়।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে ডেকে এনে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। সেই আদালতের মাধ্যমে মা ও মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার পরপরই পুরো জেলায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকাসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশিত হলে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনাটি জেলা প্রশাসনের নজরে এলে শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম মা ও মেয়েকে বেকসুর খালাস দেন। বিকেলে আদালতের আদেশ জেলা কারাগারে পৌঁছালে সন্ধ্যায় তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
মুক্তির পর মা ও মেয়ে বর্তমানে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানিয়েছেন জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল।
উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তির দাবিতে শুরু হওয়া এক তরুণীর লড়াই শেষ পর্যন্ত তাকে থানার নির্যাতন, আদালতের সাজা ও কারাগারের অন্ধকার পথ পেরিয়ে আবার মুক্তির আলোয় ফিরিয়ে এনেছে বলে মনে করেছেন নেটিজেনরা।
মন্তব্য করুন