

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী বগুড়ার শেরপুর পৌরসভা। প্রথম শ্রেণির তকমা মিললেও, দীর্ঘ দেড় দশকেও গড়ে ওঠেনি কোনো স্থায়ী বর্জ্য নিষ্কাশন কেন্দ্র বা ডাম্পিং স্টেশন। ফলে বাধ্য হয়েই ঐতিহাসিক করতোয়া নদী ও পৌর কার্যালয়ের ঠিক পেছনে ফেলা হচ্ছে শহরের শত শত টন বর্জ্য। এতে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি, ছড়াচ্ছে রোগব্যাধি।
বগুড়ার শেরপুর পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা না থাকায় জনভোগান্তি বাড়ছে। শহরের বিভিন্ন এলাকার ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে করতোয়া নদীর তীর ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে। এতে একদিকে নদী দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শেরপুর পৌরসভার আয়তন প্রায় ১০ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার। নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ পৌরসভায় জনসংখ্যা প্রায় ৬১ হাজার ১৪১ জন। পৌরসভা এলাকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ টন কঠিন ও গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর সঙ্গে হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও যুক্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে শেরপুর শহরের ঘাটপাড়, বারদুয়ারী হাট, ফুলবাড়ী ব্রিজসহ করতোয়া নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর পাড় ও আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও কোথাও স্তুপ করে রাখা হয়েছে বর্জ্য। পৌর এলাকার বাইরেও একই চিত্র দেখা গেছে।
শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের হামছায়াপুর, শেরুয়া বটতলা ও খন্দকারটোলা এলাকায় বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব এলাকায় নতুন করে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলেও বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। ফলে গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের বড় একটি অংশ করতোয়া নদীতে গিয়ে পড়ছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, শেরুয়া বটতলা এলাকায় বর্জ্য ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব প্রায় ২ দশমিক ৫ একর জায়গা রয়েছে। তবে ওই জায়গার চারপাশে আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে নিজস্ব জমি থাকা সত্ত্বেও সেটি এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাতে পারছে না পৌরসভা।
বর্তমানে পৌরসভা কার্যালয়ের পেছনের একটি জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে পৌরসভা কার্যালয় ও আশপাশের বসতবাড়িতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে চারজন চালক ও ৩৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করলেও বর্জ্য ফেলার স্থায়ী জায়গা না থাকায় সংকট কাটছে না।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, শেরুয়া বটতলার ২ দশমিক ৫ একর জায়গাটি বর্তমানে আবাসিক এলাকার মধ্যে পড়ে গেছে। সেখানে বর্জ্য ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে পৌরসভার পেছনে বর্জ্য ফেলতে হচ্ছে। এতে আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
পৌরসভার পেছনে বর্জ্য ফেলায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, ময়লা ফেলার পর তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিকেল ও রাতে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা নরপ্রন বলেন, ‘যখনই খেতে বসি, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে খেতে হয়। গন্ধে ভাত খাওয়া যায় না। জনবহুল জায়গা থেকে ময়লার ভাগাড় সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়া দরকার।’
আরেক বাসিন্দা বিকাশ বলেন, ময়লা ফেলার সময় আশপাশে অস্বস্তিকর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট কাটাতে নতুন জায়গা খুঁজছে পৌরসভা। নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, শেরুয়া বটতলার ২ দশমিক ৫ একর জায়গাটি বিক্রির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হোসনাবাদ মৌজায় প্রায় সাত একর জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ওই জমি কেনার চেষ্টা চলছে। এ জন্য প্রশাসনিক অবমুক্তির অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সেখানে স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
পৌরসভার সাবেক মেয়র জানে আলম খোকা বলেন, পৌরসভার বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। বটতলায় পৌরসভার নিজস্ব জায়গা থাকলেও সেখানে আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় ময়লা ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। একসময় শহরের পাশে ভস্তার বিল এলাকায় বর্জ্য ফেলার জন্য জায়গা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা, বেতন-ভাতা পরিশোধসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় আগের প্রস্তাবটি নাকচ করেছিল। বর্তমানে নতুন করে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও এ বিষয়ে সহযোগিতা করছেন। অনুমোদন পাওয়া গেলে স্থায়ী বর্জ্য নিষ্কাশনস্থল তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
তবে স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত করতোয়া নদী ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বর্জ্য ফেলা বন্ধ না হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। করতোয়া নদীর পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমতে থাকায় নদীর নাব্যতা ও পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ছে।


