সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতির বরপুত্র এক নিশাতের দখলে পুরো বন বিভাগ

শাহীন মাহমুদ রাসেল
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাত।
expand
বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাত।

চাঁদাবাজি, নিয়োগ বানিজ্য, পদোন্নতি, পদায়ন, বনের জমি বিক্রি ও অর্থের বিনিময়ে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) প্রদানসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে চাকুরির মাত্র ২৩ বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাত। বিএনপি শাসনামলে ২০০৩ সালে সহকারি বন সংরক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগদানকারী ওই কর্মকর্তা সবচেয়ে বেশি প্রভাব খাটিয়েছেন আওয়ামী শাসনামলে। ভোলপাল্টানো ওই কর্মকর্তা অদৃশ্য শক্তি বলে সবসময় থেকেছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টাদের আশীর্বাদপুষ্ট। এই কারণে ২৩ বছরের চাকরিজীবনে একবারের জন্যও তাকে ঢাকার বাইরে বদলি হতে হয়নি।

সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী হাসান মাহমুদকে বাবা ও সাবেক উপদেষ্টা রেজাওয়ানা হাসানকে মা ডেকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের জেলে পরিবারে জন্ম নেওয়া নিশাত বন অধিদপ্তরে লুটপাট করছেন নীরবে। তার ক্ষমতার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না জানালেও আড়ালে-আবডালে তাকে 'রাক্ষস' বলে সম্বোধন করেন তার সহকর্মীসহ বনের সাথে জড়িত লোকজন।

অনুসন্ধান, বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাঠপর্যায়ের বনকর্মী, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বন সংরক্ষক নিশাত এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।

একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার স্ত্রী, শ্যালিকা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে একাধিক বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট, প্লট ও গাড়ি থাকার তথ্য মিলেছে। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগ। দেশের বাইরেও, বিশেষ করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের এক জেলে পরিবারে জন্ম নেওয়া হোসাইন নিশাতের জীবনযাত্রার এই উত্থান এখন আলোচনার কেন্দ্র। বিসিএস ২২তম ব্যাচের মাধ্যমে ২০০৩ সালে বন ক্যাডারে যোগ দেন তিনি। সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে শুরু হওয়া এই যাত্রা এক দশক পর মোড় নেয় গুরুত্বপূর্ণ এক পদে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তিনি ঢাকার সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পান। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সেখান থেকেই শুরু তার প্রভাব বিস্তারের গল্প।

বন অধিদপ্তরের নানা অপকর্মের পেছনে 'কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক' হিসেবে হোসাইন নিশাতের নামই বেশি শোনা যায়। নিয়োগ, বদলি, পদায়ন থেকে শুরু করে চেকপোস্টকেন্দ্রিক অর্থ লেনদেন- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার প্রভাব থাকার অভিযোগ রয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো বড় সিদ্ধান্তের পেছনে তার সম্পৃক্ততার কথা ঘুরেফিরে আসে।

সোনারগাঁও ও সোনাগাজী চেকপোস্ট যেন চাঁদাবাজির স্থান:

ডিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় হোসাইন নিশাতের সবচেয়ে আলোচিত 'আয়ের কেন্দ্র' ছিল সোনারগাঁও ও সোনাগাজি চেকপোস্ট। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ গাছবোঝাই ট্রাক এই ট্রানজিট পয়েন্ট অতিক্রম করত। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো এবং এই বিপুল অর্থের সিংহভাগ চলে যেত নিশাতের পকেটে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এই অর্থের বড় অংশই যেত ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে। একজন কর্মকর্তা বলেন, চেকপোস্ট তখন শুধু নিয়ন্ত্রণ পয়েন্ট ছিল না, এটি ছিল অর্থ সংগ্রহের প্রধান উৎস।

অভিযোগ আছে, চেকপোস্টের স্টেশন অফিসার পদটিও হয়ে উঠেছিল রীতিমতো নিলামের বস্তু। মাত্র এক বছরের জন্য সেই পদে থাকতে হলে দিতে হতো ৫০ লাখ টাকা। সহকারী স্টেশন অফিসার ছিলেন ছয়জন- প্রত্যেককে পোস্টিং পেতে দিতে হতো ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে। বিনিময়ে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্ক কেন্দ্রীয়ভাবে পৌঁছানোর কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফরেস্ট গার্ড পদেও একই চিত্র। পোস্টিংয়ের জন্য সর্বনিম্ন ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। এর বাইরে কাঠের ডিপো, করাতকল, ইটভাটা এবং লাইসেন্স প্রদানের নামেও ঢাকার সামাজিক বন অঞ্চলে চলত নিয়মিত চাঁদাবাজি।

নিয়োগ ও বদলির 'কেন্দ্রবিন্দু':

২০১৬ সালের নভেম্বরে হোসাইন নিশাত দায়িত্ব পান সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) হিসেবে। এই পদে থেকেই তার হাতে আসে সারা দেশের নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের নিয়ন্ত্রণ। একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, সংস্থাপন মানেই পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ। কে কোথায় যাবে, সেটাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতা।

অভিযোগ রয়েছে, এই সময় রেঞ্জ অফিসারদের বদলিতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা, ফরেস্টারদের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ লাখ, আর বন প্রহরীদের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ বা চেকপোস্টে পোস্টিংয়ের জন্য বার্ষিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের তথ্যও পাওয়া গেছে। শতাধিক রেঞ্জ থেকে এভাবে বছরের পর বছর তোলা হয়েছে শত শত কোটি টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, 'সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব পাওয়ার পর বদলি ও পদায়ন কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যে পরিণত হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ, চেকপোস্ট কিংবা আয়বর্ধক পদে যেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আর্থিক সক্ষমতাই পোস্টিং পাওয়ার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল।'

এনওসি ও সার্টিফিকেট বাণিজ্য:

বন্যপ্রাণী আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) ইস্যুতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি সার্টিফিকেটের জন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা নেওয়া হতো বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। প্রতি মাসে ১০০ থেকে ১৫০টি এনওসি ইস্যুর মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এই সার্টিফিকেট একবার ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় প্রতিবারই নতুন করে নিতে হতো- ফলে আয়ও ছিল ধারাবাহিক।

তারেক আজিজ নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অনেক সময় এনওসি পেতে অযথা বিলম্ব করা হতো। দ্রুত অনুমোদন প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার চাপ তৈরি করা হতো। বিষয়টি ব্যবসায়ীদের জন্য এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল।

ছাত্রলীগ নেতা থেকে রেঞ্জ অফিসার:

২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বন সংরক্ষক (অর্থ ও প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নিশাত। এই সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলের বন সংরক্ষক থাকাকালে নিয়োগবিধিতে বিতর্কিত পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৮৫ সালের পুরোনো বিধি বাতিল করে নতুন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে সরাসরি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়।

বন বিভাগের একাধিক সূত্র বলছে, ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে বন বিভাগের নিয়োগ বিধিমালায় বিতর্কিত পরিবর্তন আনার পর ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার (রেঞ্জার) পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত বাচ্চু মিয়া, আব্দুল মালেকসহ প্রায় ১২০ জনকে ওই প্রক্রিয়ায় ফরেস্ট রেঞ্জার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা দাবি, দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদোন্নতি কাঠামো উপেক্ষা করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ায় বিভাগের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, শতভাগ পদোন্নতিযোগ্য একটি পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ তৈরি করে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপকে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও ওঠে, যা নিয়ে বন বিভাগের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, 'নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার চেয়ে প্রভাব ও যোগাযোগ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে এই নীতি চালু রেখেছে। ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিধিমালা পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি বিভাগে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।'

সূত্র বলছে, বন বিভাগে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নাইট গার্ড, ড্রাইভার, নৌকাচালকসহ বিভিন্ন পদে প্রায় ৪ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় 'বলাকা এন্টারপ্রাইজ'-এর মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গিয়াস তালুকদার তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী হাসান মাহমুদের চাচাতো ভাই বলে জানা গেছে। এই নিয়োগে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালে ২৮৪ জন ফরেস্ট গার্ড নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, একটি চার সদস্যের কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, যেখানে নিশাত ছিলেন অন্যতম সদস্য।

৮,৫০০ হেক্টর বনভূমি গ্রাস:

ঢাকা কেন্দ্রীয় বন অঞ্চলের দায়িত্বে থাকাকালে- যার আওতায় ছিল গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বন বিভাগ। হোসাইন নিশাতের সময়কালে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি বিভিন্ন সময়ে দখল হয়ে যায় বলে অভিযোগ আছে। সীমানা নির্ধারণ (ডিমার্কেশন) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে এসব দখলকে বৈধতার রূপ দেওয়া হয়েছে। এই জমিতে গড়ে উঠেছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা। বিপরীতে নতুন বনায়ন হয়েছে মাত্র ১,১৫০ হেক্টর।

চট্টগ্রামেও একই চিত্র। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী হাসান মাহমুদের ভাই এরশাদ হাসান রাঙ্গুনিয়ায় প্রায় ১,০০০ হেক্টর বনভূমি দখল করে ফলের বাগান, মাছের ঘের, গয়ালের খামার ও বাংলো বানিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সহযোগী ছিলেন হোসাইন নিশাত নিজেই। এক পরিবেশকর্মী বলেন, বন রক্ষার চেয়ে জমি হারানোর হিসাবই বড় হয়ে উঠেছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, হোসাইন নিশাতের নামে বা ঘনিষ্ঠদের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সম্পদ রয়েছে। চট্টগ্রামের হালিশহর ও আগ্রাবাদে বাড়ি, ঢাকার বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট ও বাড়ি, ধানমন্ডি এবং গুলশানে সম্পত্তি রয়েছে তার ঘনিষ্ঠদের নামে।

সূত্রগুলোর মতে, কানাডায় বাড়ি এবং আমেরিকায় সম্পত্তি কিনেছেন ডিএফও বেলায়েত হোসেনের মাধ্যমে, যিনি নিশাতের সহযোগী ও একই এলাকার মানুষ বলে জানা গেছে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, 'সরকারি চাকরির বেতনে এই সম্পদ ব্যাখ্যা করা কঠিন। আপনারা অনুসন্ধান করেন সব পেয়ে যাবেন।'

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ টিকে থাকার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ডক্টর হাসান মাহমুদ ও বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার ছিলেন তার প্রধান 'আশ্রয়দাতা'। নিশাত হাবিবুন নাহারকে 'মা' এবং সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সাহাব উদ্দিনকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন বলে জানা যায়। তাদের দাবি, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণেই অনেক অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি। বনের ভেতরে জমি দখল, গাছ পাচার কিংবা অনুমোদন-বাণিজ্য- এসব ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ রয়েছে।

সুত্রগুলোর ভাষ্য, বনে যেখানে অনিয়ম, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে নিশাতের নাম উঠে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, 'সংস্থাপন শাখা হলো বন বিভাগের সবচেয়ে প্রভাবশালী জায়গা। কে কোথায় যাবে, কে পদোন্নতি পাবে, কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবে, সবকিছুই এই শাখা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল। যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন হোসাইন নিশাত।'

বন বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, 'এনওসি ইস্যু একটি লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছিল। প্রতিমাসে বিপুল সংখ্যক এনওসি দেওয়া হতো এবং প্রতিটি অনুমোদনের সঙ্গে লাখ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হতো। বন বিভাগের ভেতরে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস করতেন না।'

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, 'বদলি, পদায়ন, এনওসি, লাইসেন্স ও নিয়োগ, সব ক্ষেত্রেই একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন হোসাইন নিশাত। তার অপরাধ এতটাই বিস্তৃত যে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। যা আপনারা লিখে শেষ করতে পারবেন না।'

জানতে চাইলে অভিযুক্ত হোসাইন নিশাত প্রথমে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'আপনারা আরেকটু ক্রসচেক করেন।' পরে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই শেষে তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য চেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমিন হোসাইন চৌধুরীর সাথেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সাক্ষাৎ দেননি। পরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক হোসেন জানান, প্রধান বন সংরক্ষক প্রতিবেদকের সাথে সাক্ষাতে কোনো বক্তব্য দেবেন না। ফারুক হোসেন বলেন, 'বক্তব্য প্রয়োজন হলে তাকে মেইল করতে পারেন।' সেই মোতাবেক মেইল করা হলেও কোনো জবাব আসেনি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন