রবিবার
০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মায়ের পিঠই যেন সন্তানের পৃথিবী

এম এ মাসুদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
মায়ের পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অবিনাশ
expand
মায়ের পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অবিনাশ

'মায়ের পিঠই যেন সন্তানের পৃথিবী' এমন বাক্য মনে করলেই সবার চোখে ভেসে ওঠে এক পরিচিত দৃশ্য—পিঠে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে নিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছেন তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, কিন্তু তবুও থেমে নেই পথচলা।

মায়ের সাথে সন্তানের এমন সম্পর্ক চিরায়ত। এই চিরায়ত সম্পর্কই যেন ২৮ বছরের সন্তানকে আজও পিঠে বহন করার শক্তি জোগায়। বাঁচার সাহস যোগায় নতুন করে। সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা ও ত্যাগের এমন দৃশ্য দেখা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বেলকা বাজারের পশ্চিম ধারের মাঝি পাড়া গ্রামে।

মমতাময়ী এই মায়ের নাম মিনা রানি দাস। আর পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো সন্তান হলেন- অবিনাশ।

প্রায় ২৮ বছর আগের কথা। মিনা ও লাল চাঁদ দম্পতির দ্বিতীয় সন্তানও ছেলে হওয়ায় আনন্দে ভাসছিলেন তারা। ফুটফুটে বলে নাম রাখেন অবিনাশ। কিন্তু বছর পেরুনোর পরেই ঘটে সর্বনাশ। একদিন প্রচন্ড জ্বর আসে শিশু অবিনাশের। বাবা লাল চাঁদ সন্তানের কষ্ট সইতে না পেরে রাতেই ডেকে আনেন স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসককে। জ্বর নিয়ন্ত্রণে আনতে শিশু অবিনাশের শরীরে পুশ করা হয় ইঞ্জেকশন। ইঞ্জেকশন দেওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসলো বটে। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই শুরু হয় খিচুনি ও মুখ দিয়ে লালা পড়া।

পরে দ্বারস্থ হন তারা হোমি চিকিৎসক ও কবিরাজের কাছে। ধারদেনা করে চিকিৎসার চেষ্টা করেও কোনো ফল পাননি তারা। অবশ হয়ে যায় শিশু অবিনাশের দুই পা এবং নড়বড়ে হয় কাঁধ। সময় গড়ানোর সাথে সাথে মা মিনা রানি মেনে নেন নিয়তির এই নির্মম বাস্তবতাকে।

শিশুকালে কোলে করে নিয়ে বেড়ানো সহজ হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ওজনও বাড়তে থাকে। তখন অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন ছেলেকে ঘরে রেখে কাজ করতে। কিন্তু সেই পরামর্শ মানেননি তিনি। তার বিশ্বাস, সন্তান কোনো বোঝা নয়। বরং তার দায়িত্ব পালন করাই একজন মায়ের সবচেয়ে বড় কর্তব্য। সেই কর্তব্যবোধ থেকেই বাজারে যাওয়া, চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া কিংবা গ্রামের কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই সন্তানকে পিঠে নিয়েই ছুটেছেন তিনি। এমনকি কৃষি শ্রমিক হিসেবে মাঠে কাজ করতে গেলেও পিঠে করে নিয়ে যান সন্তান অবিনাশকে। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি, কখনো কাদামাটির রাস্তা—কোনো বাধাই থামাতে পারেনি এই মাকে।

মিনা রানি বলেন, 'আমার ছেলে যদি পৃথিবী দেখতে না পারে, মানুষের সঙ্গে মিশতে না পারে, তাহলে তার জীবনটা যে আরো কষ্টের হয়ে যাবে।'

তিনি আরো বলেন, 'গায়ে যতদিন শক্তি আছে, ততদিন তাকে পিঠে নিয়ে চলব। কিন্তু ওকে পিঠে করে টানতে টানতে আমার কোমরের ওপরের হাড়ও (মেরুদণ্ড) তো বাঁকা হয়ে গেছে। এখন আমাকেও ওষুধ খেতে হয়। সেই টাকা কোথায় পাব? কে দেবে? সবাই একটু সহযোগিতা করলে হয়তো অবিনাশ ও আমার চিকিৎসা করতে পারতাম। ছেলেকে নিয়ে বাঁচতে পারতাম হয়তো আরো অনেকদিন!' স্থানীয়রা বলছেন, 'মিনা রানি দাসের এই সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। আমরা বহু বছর থেকে দেখে আসছি, তিনি ছেলেকে পিঠে করে নিয়ে চলেন। এত বছরেও তার ভালোবাসা একটুও কমেনি। এটা সত্যিই বিরল।'

ছেলেটি প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এ জন্য পরিবারটির প্রতি বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত।

স্থানীয় সমাজকর্মীরা মনে করেন, এমন পরিবারগুলোর পাশে সরকার ও সমাজের আরও বেশি করে দাঁড়ানো প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজ চলাচলের ব্যবস্থা, উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

তাদের মতে, একজন মায়ের পক্ষে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে পিঠে বহন করা শুধু ভালোবাসার নয়, রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘাটতিরও একটি প্রতিচ্ছবি।

মায়ের পিঠে প্রতিবন্ধী সন্তানের ২৫ বছরের এই যাত্রা কেবল একটি পরিবারের সংগ্রামের গল্প নয়; এটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও মানবিকতার এক অনন্য নজির। যেখানে অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়, সেখানে একজন মা প্রমাণ করেছেন—সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা সীমাহীন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন