সোমবার
১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আ.লীগ নেতাদের সুপারিশে চাকরি, প্রভাবের বলয়ে আহম্মদুল্লাহ

শাহীন মাহমুদ রাসেল
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
বিপিসি'র উপ-ব্যবস্থাপক মো. আহম্মদুল্লাহ
expand
বিপিসি'র উপ-ব্যবস্থাপক মো. আহম্মদুল্লাহ

২০১৯ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) উপ-ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন মো. আহম্মদুল্লাহ। নিয়ম অনুযায়ী কর্মকর্তাদের তিন বছর পরপর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছরের বেশি সময় ধরে একই বলয়ে বহাল রয়েছেন এই কর্মকর্তা।

ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য বলছে, চাকরিজীবনের পুরো সময়ই তিনি কাটিয়েছেন বিপিসির এই গুরুত্বপূর্ণ বলয়ের ভেতরে। চাকরির শুরুতে মাঠপর্যায়ে পদায়ন পেলেও পরে আর চট্টগ্রামের বাইরে যেতে হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতা, প্রভাব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের আস্থাভাজন হয়ে ওঠার সুযোগে বছরের পর বছর একই জায়গায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন আহম্মদুল্লাহ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরেই বিপিসিতে তার প্রবেশ এবং পরে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বলয়ে অবস্থান তৈরি হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আহম্মদুল্লাহর নিয়োগকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন ছিলো। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমানের আশীর্বাদেই তিনি এই চাকরি পান।

জানা যায়, সামছুর রহমান এবং আহম্মদুল্লাহ দুজনেই বরিশাল অঞ্চলের বাসিন্দা। সামছুর রহমানের একমাত্র মেয়ের গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সময় আহম্মদুল্লাহ তার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই বিপিসিতে তার চাকরি নিশ্চিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিপিসিতে যোগদানের পর থেকেই আহম্মদুল্লাহর উত্থান ছিল দ্রুত। তার এই উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয়েরও ভূমিকা রয়েছে।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার দিবাকরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা হলেও তিনি ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে চাকরিতে প্রবেশ করেন আহম্মদুল্লাহ। চাকরির আবেদনের সময় তিনি আওয়ামী লীগের একটি প্রত্যয়নপত্রও জমা দেন। প্রত্যয়নপত্রে ঝালকাঠির নথুল্লাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সেলিম শাহ তাকে স্থানীয় ওয়ার্ডের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিপিসিতে প্রবেশের পর তিনি দ্রুত ক্ষমতার বলয়ে পৌঁছে যান। আহম্মদুল্লাহর শ্বশুর ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস)। পারিবারিক সেই যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় বিপিসিতেও তার প্রভাব বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে তিনি বিপিসি চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

এই পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) সমমানের হলেও তিনি উপ-ব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হয়েও দীর্ঘদিন ধরে ওই পদে বহাল রয়েছেন। বিপিসির প্রবিধানমালা অনুযায়ী বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চেয়ারম্যানের পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আহম্মদুল্লাহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রণালয় এবং ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনে বিভিন্ন লকারে সংরক্ষণ করেছেন। রাজধানীর মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি কিনেছেন বলে জানা গেছে। গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। এছাড়া মিরপুর এলাকায় তার নামে দুটি রেস্টুরেন্ট থাকার কথাও জানা গেছে। এছাড়া কোটি কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর করেছেন এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের শেয়ারও কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নামেও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চেয়ারম্যানের পিএস হিসেবে থাকাকালে তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাও কিছু বলতে পারেননি।

২০২১ সালের ৩ অক্টোবর দুর্নীতির অভিযোগে তাকে চেয়ারম্যানের পিএস পদ থেকে সরিয়ে চট্টগ্রাম প্রধান কার্যালয়ের হিসাব বিভাগে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। তবে মাত্র একদিনের মধ্যেই সেই অফিস আদেশ বাতিল হয়ে যায় এবং তিনি আবার আগের পদে ফিরে আসেন।

তৎকালীন বিপিসি চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ বলেন, আমরা নিয়ম অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। পরে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ গাড়িও তিনি নিজের ও পরিবারের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। যদিও তিনি সেই গাড়ি ব্যবহারের অগ্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তা নন। ব্যবহৃত গাড়িগুলোর নম্বর ১১-৩২৬২ এবং ৯৬১৪ বলে জানা গেছে। এ নিয়ে বিপিসির ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিজের প্রভাব ধরে রাখতে তিনি বরিশাল অঞ্চলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। বিপিসি চেয়ারম্যানের কার্যালয়, পরিচালক দপ্তর, ঢাকার অফিস এবং রেস্ট হাউসে অন্তত ১০ জন বরিশাল অঞ্চলের কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। ঢাকা রেস্ট হাউস ও লিয়াজো অফিসেও আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিপিসির বিভিন্ন ডিপো ও ব্যবসায়িক পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহ, টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য ও পদোন্নতি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে অর্থ আদায় করা হতো। রেস্ট হাউসে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাব পছন্দের ব্যাংকে স্থানান্তর করে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আত্মীয়দের বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি দিয়ে সেই ব্যাংকগুলোতে বিপিসির বিপুল অর্থ জমা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কয়েকটি ব্যাংকে বিপিসির প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এখনও আটকে রয়েছে।

আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছিল বলে জানা গেছে। তবে সেই অনুসন্ধানের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। সম্প্রতি তিনি তার সম্পদের হিসাব দুদকে জমা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত মো. আহম্মদুল্লাহ্’র মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও সেখানেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনিও ফোন ধরেননি। পরে আহম্মদুল্লাহ্ সম্পর্কিত অভিযোগগুলো নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও, সেখানেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন