

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


শনিবার ও বুধবার বিশাল হাট বসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মীরগঞ্জ বাজারে। সেই হাটে কৃষকরা আনেন তাদের উৎপাদিত আলু, বেগুন, করলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, ধনেপাতা, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও আদাসহ নানা পণ্য। খাজনা বেশি আদায় করা যাবে বলে এসব পণ্য রাখার জায়গা করে দেন ইজরাদারের মাসোহারা পাওয়া কর্মীরা। কৃষকরাও ইচ্ছেমত দাম হাঁকিয়ে বিক্রি করছেন সেসব পণ্য।
কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা গেল, অনেকের আগে আসা কয়েকজন শিশুর ক্ষেত্রে। যারা বস্তায় ভর্তি করে এনেছিলেন শাকের আঁটি। একবার কৃষক তো আরেকবার ইজারাদারের লোক 'শাকের বস্তা' সরাতে বলছেন তাদের। কৃষক আর ইজারাদারের ঠেলাঠেলিতে চোখ-মুখে রীতিমতো আতংকের ছাপ। বারবার বস্তা সরাতে সরাতে হয়রান তারা। পরে শিশুদের এভাবে হয়রানি না করতে বললে, খানিকটা আশ্বস্ত হয় ওই শিশুরা।
স্কুলে পড়া এসব শিশু বই, খাতা ও কলম কেনাসহ পরিবারের টুকিটাকি খরচ মেটাতে হাঁটের আগে সারাদিন ধরে চরের আলু, ভুট্টা ও গম ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করে থাকে প্রকৃতিতে জন্ম নেওয়া 'বেথো শাক।'
বেথো, বেথে বা বথুয়া যে নামেই ডাকা হোক না কেন- তা মূলত আগাছা গোত্রের। কিন্তু গ্রাম বাংলায় এটি একটি জনপ্রিয় শীতকালীন শাক হিসেবে সমধিক পরিচিত।
স্বাদ ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই শাক কষ্ট করে তুলে এনে পাইকারি বাজারে প্রতিটি আঁটি বিক্রি করছে শিশুরা ১ টাকা করে। এতো খাটুনির পর কম দাম পেলেও 'মরার ওপর খাড়ার ঘা' হিসেবে হাজির হলো ইজারাদারের লোক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তাদের খাজনার অংক শুনে চোখে টলমল অবস্থা শিশুদের। কী হয়েছে জানতে চাইলে শাক নিয়ে আসা ৮ম শ্রেণিতে পড়া রাজু, ৭ম শ্রেণির মিম, ৪র্থ শ্রেণির রবিউল, ৩য় শ্রেণির বায়েজিদ ও মশিউর এবং ২য় শ্রেণিতে পড়ুয়া সিরাজুল ইসলাম সমস্বরে বলেন, 'দেখেন না, সারাদিন ধরে শাক তুলে ভোরে সবাই মাথায় করে বস্তা নিয়ে এসেছি হাটে। বিক্রি করলাম ১ টাকা করে আঁটি। এক বস্তা বিক্রি করে ৬০-৭০ টাকা হয়। আর সবাই টাকা চায় বেশি। আমাদের কষ্ট করে কী লাভ হলো?'
পরে ইজারাদার ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে বললে শিশুদের ছেড়ে দেয় তারা। কথা বলার লোক পাশে পেয়ে বেজায় খুশি শিশুরা।
তারা বলছেন, আমাদের বাড়ি কারো ৬ কিলোমিটার দূরের চর বিরহিম, আবার আরো বাড়ি চর সন্তোষ গ্রামে। আমাদের কারো বাপ নেই, কারো নেই মা। আবার কারো বাপ-মা থাকলেও আমরা গরিব। তাই স্কুলের ফাঁকে ফাঁকে কাজ করি। শাকও তুলি। সেই টাকা দিয়ে পরীক্ষার ফি দেই। নোট বই, খাতা, কলম কিনি। টাকা জমিয়ে শার্ট, প্যান্টও কিনি।
তারা আরো বলেন, 'এই বয়সে আমাদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা আর হৈ-হুল্লোড় করে বেড়ানোর কথা। কিন্তু কী করব কন- বাপ-দাদার আমলে তিস্তা যে সব ভেঙে নিয়ে গেছে। কাজ না করলে খরচ যোগাবো কীভাবে?'
মন্তব্য করুন
