


আগামী ১ মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিন কার্ডধারীরা আর স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এসবিএ)-সমর্থিত ঋণের জন্য যোগ্য হবেন না, নতুন এক ফেডারেল নীতিমালায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে।
সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, এসবিএ ঋণের জন্য আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা ইউএস ন্যাশনাল হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা তার অধিভুক্ত অঞ্চলে প্রধান আবাস বজায় রাখতে হবে।
নতুন নিয়মে আরও বলা হয়েছে, কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায় মাত্র ১ শতাংশ মালিকানাও যদি কোনো গ্রিন কার্ডধারীর থাকে, তাহলে সেই ব্যবসা এসবিএ ঋণের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
এর আগে এসবিএ’র ৭(এ) ও ৫০৪ ঋণ কর্মসূচির আওতায় বৈধ স্থায়ী বাসিন্দারা নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ পেতেন। ফলে এই পরিবর্তনকে নীতিগতভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তে হাজারো অভিবাসী উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, যারা ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে এসবিএ ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এসবিএ–সমর্থিত ঋণ সাধারণত কম সুদ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধা দেয়, যা অনেক ছোট ব্যবসার জন্য টিকে থাকার অন্যতম ভরসা।
বিশেষ করে খুচরা ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ ও ডে-কেয়ার সেক্টরের মতো ক্ষেত্রে অভিবাসী উদ্যোক্তারা এ ধরনের ঋণের ওপর নির্ভর করে থাকেন।
ব্যবসায়িক সংগঠন ও অভিবাসী অধিকারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ গ্রিন কার্ডধারীরাও কর প্রদান করেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১ মার্চের আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর বিষয়ে কোনো রূপান্তরকালীন (ট্রানজিশন) সুবিধা থাকবে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে অনেক আবেদনকারী বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই নিজেকে এমন এক দেশ হিসেবে গর্ব করে এসেছে, যেখানে কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা ও উদ্ভাবনী শক্তি মানুষকে সুযোগের দ্বার খুলে দেয়।
এই প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে সবসময়ই ছিলেন অভিবাসীরা যারা ব্যবসা গড়েছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং দেশের সর্বত্র কমিউনিটিকে শক্তিশালী করেছেন।
তবে স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এসবিএ)-এর একটি নতুন নীতি এই ঐতিহ্যকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং অভিবাসী পরিবার ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে কংগ্রেশনাল এশিয়ান আমেরিকান ককাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে এসবিএ ঋণের জন্য আবেদনকারী প্রত্যেককে মার্কিন নাগরিক বা মার্কিন ন্যাশনাল হতে হবে এবং তাদের প্রধান বসবাসের ঠিকানা যুক্তরাষ্ট্র বা তার অধীনস্থ অঞ্চলে থাকতে হবে।
সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ছোট ব্যবসায় যদি একজন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা যাকে সাধারণত গ্রিন কার্ডধারী বলা হয় মাত্র ১ শতাংশ মালিকানাও রাখেন, তবে সেই ব্যবসা এসবিএ ঋণের অযোগ্য হয়ে যাবে।
এই পরিবর্তন পূর্ববর্তী নীতির তুলনায় বড় এবং ক্ষতিকর বিচ্যুতি। এতদিন পর্যন্ত এসবিএ’র ৭(এ) এবং ৫০৪ ঋণ কর্মসূচির আওতায় গ্রিন কার্ডধারী বা বিদেশি নাগরিকরা কোনো ব্যবসার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ মালিকানা থাকলেও সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগের নির্দেশনায় চীনা নাগরিকদের সরাসরি অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল যা ফেডারেল নীতিতে বৈষম্য ও পক্ষপাতের প্রশ্ন উত্থাপন করে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব বিশেষ করে এশিয়ান আমেরিকান, নেটিভ হাওয়াইয়ান এবং প্যাসিফিক আইল্যান্ডার (এএএনএইচপিআই) কমিউনিটির জন্য মারাত্মক হতে পারে।
এশিয়ান আমেরিকানদের ৬৫ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৩০ লাখের বেশি এএএনএইচপিআই মালিকানাধীন ছোট ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
এসব ব্যবসায় প্রায় ৫২ লাখ মানুষ কর্মরত এবং বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়। এগুলোই পাড়া-মহল্লার রেস্টুরেন্ট, পারিবারিক খুচরা দোকান, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র ও প্রযুক্তি স্টার্টআপ দেশের স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি।
নিউ ইয়র্কের প্রতিনিধি ও কংগ্রেশনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাসের চেয়ার গ্রেস মেং এই নীতির নিন্দা করে বলেন, আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে সুযোগের দেশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে কঠোর পরিশ্রম একটি উন্নত জীবনের দ্বার খুলে দেয়।
এসবিএ’র এই সিদ্ধান্ত পরিশ্রমী বৈধ অভিবাসীদের ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি থেকে বঞ্চিত করবে এবং লক্ষ লক্ষ এএএনএইচপিআই পরিবারকে কার্যত আমেরিকান ড্রিম থেকে বাইরে ঠেলে দেবে।
ছোট ব্যবসার জন্য পুঁজি প্রাপ্তি বিলাসিতা নয় এটি অপরিহার্য। এসবিএ-সমর্থিত ঋণ অনেক সময় দোকান খোলা বা বন্ধ রাখা, নতুন কর্মী নিয়োগ বা ছাঁটাই, অর্থনৈতিক মন্দায় টিকে থাকা বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।
গ্রিন কার্ডধারী ও অন্যান্য অ-নাগরিকদের বাদ দেওয়া মানে হাজারো সম্ভাবনাময়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী ব্যবসাকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার থেকে বঞ্চিত করা।
অভিবাসী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসাগুলো দেশের সবচেয়ে উদ্যোক্তা-চেতনার উদাহরণ। ২০২৪ অর্থবছরে এসবিএ এশিয়ান মালিকানাধীন ব্যবসাগুলোর জন্য ৮,৯০০টি ঋণ অনুমোদন করেছে, যার মোট পরিমাণ ছিল ৭.২ বিলিয়ন ডলার।
পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এশিয়ান ব্যবসায়ীদের জন্য অনুমোদিত ঋণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই বিনিয়োগগুলো প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে, কর্মসংস্থান বাড়িয়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। নতুন নীতি এই অগ্রগতিকে এক ঝটকায় উল্টে দিতে পারে।
প্রভাবিত ব্যবসাগুলোর অনেকই পারিবারিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে অভিবাসী বাবা-মা তাদের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের সঙ্গে মিলেই ব্যবসা পরিচালনা করেন।
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, শুধু একজন অভিভাবক গ্রিন কার্ডধারী হওয়ার কারণে সেই মার্কিন নাগরিক সন্তানও ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে অবিবেচক নয় এটি আমেরিকান মূল্যবোধের পরিপন্থী।
গ্রেস মেং সতর্ক করে বলেন, এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত বিদেশবিদ্বেষ থেকে উৎসারিত এবং এটি আমাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করবে, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং উদ্যোক্তা মনোভাবকে দমিয়ে দেবে যা আমাদের দেশকে মহান করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন