

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবেছিলেন, বাঙালি জাত্যভিমানে বাতাস দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় ভোটে জিততে সাংগঠনিক শক্তিতে ভর দিয়ে মুসলমান ও নারীশক্তির ভরসায় উতরে যাবেন। সন্দেহ নেই, তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি গোটা রাষ্ট্র শক্তিকে এককাট্টা করেছিল। লড়াইটা তাই ছিল অতীব কঠিন। ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার যাবতীয় ক্ষোভ ‘বাঙালিয়ানা’ নামের কার্পেটের তলায় চাপা দিতে পারবেন। বাঙালি অস্মিতা তাঁকে তরিয়ে দেবে বহিরাগতদের ঠেকিয়ে।
অথচ ফল হলো উল্টো। এ যেন ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের ফলাফলের ‘মিরর ইমেজ’। সেবার ২০০ পার হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি থমকে দাঁড়িয়েছিল ৭৭–এ। এবার মমতা থমকে গেলেন আশির আশপাশে, বিজেপি ২০০ পার। অতঃপর প্রশ্ন, কী করবেন পরাজিত নেত্রী?
আহত বাঘিনীর মতো মমতা কি আবারও ঘুরে দাঁড়াবেন, নাকি বয়স ও পরিস্থিতির চাপ মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে পাদপ্রদীপের আলো থেকে সরে যাবেন—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে বিজেপির যাঁকে দীর্ঘদিন ‘দিদির ভাতিজা’ বা ‘ভাইপো’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছে, সেই অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও।
সমর্থকেরা অবশ্য এখনো আশাবাদী, সাম্প্রতিক ধাক্কা কাটিয়ে তিনি ঘুরে দাঁড়াবেন।
অনেকের মতে, রাজ্যে মমতার পক্ষে আগের মতো দাপট দেখানো এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। বিপুল ভোটের ফলাফল, বিজেপির সর্বভারতীয় শক্তি এবং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া নজরদারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক গতিপথ সীমিত হয়ে পড়তে পারে সর্বভারতীয় রাজনীতির দিকে। সেখানে তিনি কী ভূমিকা নেবেন, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
এই নির্বাচনের আগপর্যন্ত সর্বভারতীয় রাজনীতির বিরোধী পরিসরে মমতার যে অবস্থান ছিল, হারের পর অবশ্যই তাতে বদল ঘটবে। শক্তির দিক থেকে যে অবস্থান থেকে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত নিতেন, বিরোধী রাজনীতিতে নিজের অভিমত যেভাবে জাহির করতেন, এখন কি তা পারবেন? সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে শ্রদ্ধামিশ্রিত সুসম্পর্ক থাকলেও, মমতা কোনো দিনই নেতা হিসেবে রাহুল গান্ধীকে মেনে নেননি।
বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ গঠনের সময় নেতৃত্বের প্রশ্নে মমতা বারবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি নীতীশ কুমার যতদিন ওই জোটে ছিলেন, তখনও রাহুলের পরিবর্তে তাঁকে নেতৃত্বে আনার প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন মমতা। রাহুলের ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ নিয়েও তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। সংসদ চলাকালীন বিরোধী ফ্লোর কো–অর্ডিনেশনে তৃণমূল সব সময় একমত হয়নি, বরং নিজেদের আলাদা অবস্থান বজায় রাখার দিকেই বেশি জোর দিয়েছে।
এই অবস্থান অনেক বিশ্লেষকের মতে বিজেপির জন্য পরোক্ষভাবে সুবিধাজনক হয়েছে। কারণ, নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরেই কংগ্রেসকে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন রাখতে আগ্রহী। বিরোধী জোটের নেতৃত্বে কংগ্রেসকে শক্ত অবস্থানে যেতে না দেওয়াই বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কংগ্রেসই এখনও বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে থেকে গেছে, কারণ তাদেরই সবচেয়ে বিস্তৃত জাতীয় উপস্থিতি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মমতার কংগ্রেস থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল বিজেপির লক্ষ্যপূরণে সহায়ক হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থী দিয়ে কংগ্রেসের ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব ও যোগ্যতা নিয়ে মমতার প্রকাশ্য মন্তব্যও রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চললেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার না করা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যা রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এ থেকেই জন্ম ‘দিদি–মোদি সেটিং’ তত্ত্ব। রাজনৈতিক মহলে এই তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ও জল্পনার অন্ত ছিল না। কানাকানি হতো, ‘রাজ্যে দিদি–মোদির কুস্তিটা নকল, কেন্দ্রে দুজনের দোস্তিটা আসল।’ দিল্লি গিয়ে মোদির সঙ্গে মমতা একা দেখা করতেন।
একবার হলুদ গোলাপগুচ্ছ নিয়ে দেখা করার ছবি ছাপা হওয়ার পর ছড়াকারেরা ছড়া বেঁধেছিলেন, ‘রাজ্যে কুস্তি, কেন্দ্রে দোস্তি’। এমন যুক্তি শোনা যেত, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াই যখন মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তখন মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে সন্তুষ্ট রেখে তাঁকে দিয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে বিরোধীদের ছাড়া–ছাড়া রাখাটাই বিচক্ষণের রাজনীতি।
এবারের ভোটের ফল সেই তত্ত্ব পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিল। সেই সঙ্গে তুলে দিল মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা। গত সোমবার ভোটের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর রাহুল ফোন করেছিলেন মমতাকে। মমতার ‘১০০ আসনে ভোট চুরির’ অভিযোগকে রাহুল সমর্থন করেছেন।
রাহুল অবশ্যই চাইবেন শর্তহীন মমতাকে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে বেশি করে শামিল করতে। রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে পরাস্ত ও বিপর্যস্ত মমতারও হয়তো এ ছাড়া অন্য উপায় নেই।
অভিষেকের জন্যই পাঁচ বছর ধরে আইপ্যাক হয়ে উঠেছিল দলের চোখ ও কান। আইপ্যাকের সিদ্ধান্তই হয়ে দাঁড়িয়েছিল চূড়ান্ত। ভোটের প্রচার পর্বে এই সংস্থার অফিস ও কর্তার বাড়িতে ইডি তল্লাশি করতে গিয়েছিল। সেখানে হাজির হয়ে মমতা ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন দরকারি কাগজপত্র ও ল্যাপটপ। গ্রেপ্তারও হন সংস্থার এক বড় কর্তা। তারপরই তারা জানায়, রাজ্যের সব কাজ তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখছে।
ভোট–বিপর্যয়ের পর তৃণমূল নেতৃত্ব যাবতীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত আগের মতো আইপ্যাকের হাতে তুলে দেয় কি না, কিংবা আইপ্যাকও আবার আগের মতো তৃণমূলের সঙ্গে কাজ করে কি না, সেটা দেখার বিষয়। এই সংস্থার ৪১ হাজার কর্মীর হাতেই ছিল দলের কৌশল স্থির করা ও তা বাস্তবায়নের ভার।
ভাষ্যনির্মাণ, প্রচারকৌশল ও স্লোগান সৃষ্টির ভার, এমনকি কোন আসনের প্রার্থী হওয়ার উপযুক্ত কে, কোন নেতা কোথায় কী ধরনের ভাষণ দেবেন, সবকিছু আইপ্যাক ঠিক করে দিত। ফলে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্ন হয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের যোগসূত্র। বারবার জানিয়েও কোনো প্রতিকার হয়নি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সঙ্গে আইপ্যাকের সম্পর্ক কেমন থাকে, সেটাও এক বড় প্রশ্ন। মমতা ও অভিষেকের মতো আইপ্যাকের ভবিষ্যৎও এখন আতশি কাচের তলায়।
মন্তব্য করুন