


কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণার দাবিতে সব জেলায় সমাবেশ এবং মহানগর ও রাজধানীতে মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশ। এরপরও দাবি আদায় না হলে ঢাকা অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর রমনার ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় উলামা মাশায়েখ সম্মেলন থেকে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা ও তাদের যাবতীয় প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে এ সম্মেলনের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশ।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, কাদিয়ানিদের ভ্রান্ত মতবাদের প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে সব মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকদের কাছে আকিদায়ে খতমে নবুওয়তবিষয়ক বই-পুস্তক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হবে; আগামী ছয় মাসের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রতিটি জেলায় খতমে নবুওয়ত সমাবেশ করা হবে; পর্যায়ক্রমে দেশের আট বিভাগে মহাসমাবেশ করা হবে; প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হবে; রাজধানীতে ‘আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসমাবেশ’ করা হবে এবং দেশের প্রতিটি জামে মসজিদে জুমুআর বয়ানে ‘আকিদায়ে খতমে নবুওয়ত’ বিষয়ে বিশেষ আলোচনা এবং সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহতভাবে পালন করা হবে।
কর্মসূচি ঘোষণা করে আয়োজক সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, ‘সরকার যদি তাদের দাবি মেনে না নেয়, তাহলে রাজধানীর মহাসমাবেশ থেকে ঢাকা অচল বা অবরোধ, জাতীয় সংসদ ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে।’
দাবিগুলো হলো, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণা করতে হবে; তারা মুসলমানদের মসজিদ, আজান, নামাজ, ইমাম, খলিফা, বাইয়াত ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারবে না; এ সম্প্রদায়ের বই, লিটারেচার, ম্যাগাজিন, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং প্রচারণা ও প্রকাশনামূলক উপাদান বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করতে হবে একইভাবে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ ইন্টারনেটে পরিচালিত তাদের সব অ্যাপস ও ওয়েবসাইট বন্ধ করতে হবে।
দাবির মধ্যে রয়েছে, মহান আল্লাহ, সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং কোরআন-সুন্নাহ তথা, ইসলামের অবমাননার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করতে হবে; মুসলমানদের সঙ্গে কাদিয়ানীদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং মুসলিম কবরস্থানে তাদের মৃতদের দাফন নিষিদ্ধ করতে হবে; জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘খতমে নবুওয়ত’র ঈমান ও আকিদার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে তাদের ধর্মীয় পরিচয় ‘কাদিয়ানী’ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে।
এ ছাড়া কাদিয়ানীদের পৃষ্ঠপোষক বহুজাতিক কোম্পানি প্রাণ-আরএফএলকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ইজারা প্রত্যাহার করতে হবে।
দাবির মধ্যে আরও রয়েছে, মাওলানা সা’দকে বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে এবং সা’দপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি প্রদান করা যাবে না এবং হেজবুত তওহীদকে নিষিদ্ধ করে তাদের সব প্রচার ও প্রকাশনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।
ওলামা সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ্ বাবুনগরী। তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব।
এতে তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো, জাতীয় সংসদে আইন পাস করে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; কাদিয়ানিরা মুসলমানদের ব্যবহৃত মসজিদ, আজান, নামাজ বা খলিফার মতো ধর্মীয় পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে পারবে না এবং কাদিয়ানিদের বই-পুস্তক, লিটারেচার, ওয়েবসাইট ও প্রচারমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করতে হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল ধর্মমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের। অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত না হওয়ায় তার লিখিত বক্তব্য সম্মেলনে পড়ে শোনান মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী।
এতে বলা হয়, সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে যেসব দাবি জানানো হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। সরকার এ গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো বিশেষ বিবেচনায় নিবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনে সরকার ও বিরোধী দল যেন জাতীয় সংসদে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার বিল উত্থাপন করে, সে দাবি জানান বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, এটি না করলে তৌহিদী জনতা সমুচিত জবাব দেবে।
কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার জন্য বিরোধী দল যেন সংসদে বিল উত্থাপন করে সে দাবি জানান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। এরপরও সরকার সিদ্ধান্ত না নিলে আগামী নভেম্বরে সংসদ ঘেরাও কর্মসূচি দিতে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক বলেন, ‘কাদিয়ানীরা মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা এ দেশের দুশমন। তাদের এই প্রতারণা বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে সেই ঘোষণা দিতে অসুবিধা কোথায়? বর্তমান সরকার যদি মুসলমানদের পালস না বুঝে তারা পদে পদে বিপদে পড়বে।’
সভাপতির বক্তব্যে তাহাফফুযে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের সভাপতি ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান খতমে নবুওয়তের আকীদা সংরক্ষণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সব আলেম-উলামা, মাশায়েখ ও তাওহিদী জনতাকে তিনি আন্তরিক মোবারকবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, ‘খতমে নবুওয়তের ঈমানী দায়িত্ব পালনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
আগামী দিনে ঘোষিত সব কর্মসূচিতে সর্বস্তরের তাওহিদী জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঈমানী চেতনা ও দায়িত্ববোধ থেকে সবাই এসব কর্মসূচি সফল করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন।
সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব কেফায়াতুল্লাহ আজহারী, আব্দুল কাইয়ুম কাসেমী, এনামুল হক মুসার সঞ্চালনায় এসময় হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক খলিল আহমাদ কুরাইশী, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল আওয়াল, মুফতি জসিম উদ্দীন, খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, একরাম হোসাইন, মুফতি কিফায়াতুল্লাহ, মাহফুজুল হক, মাওলানা মামুনুল হক, ড. আহমদ আব্দুল কাদের, মুফতি মুবারকুল্লাহ, আহমদ আলী কাসেমী, আবদুল বাসিত খান, মুফতি বশীরুল্লাহ, শাব্বির আহমাদ রশিদ, খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, নাজমুল হাসান কাসেমী, বাহাউদ্দিন বাকারিয়া, হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, মনির হোসাইন কাসেমী, আজিজুল হক ইসলামাবাদী, আতাউল্লাহ আমিন, মুফতি উবায়দুল্লাহ, মাওলানা জহুরুল ইসলাম, মাওলানা আনাস ভোলা, শওকত হোসেন সরকার, মাওলানা মাসউদুল করীম, সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, মুহাম্মদুল্লাহ এম পি, মাওলানা মীর ইদ্রিস, মাওলানা ইউনুস ঢালী, আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।