


রাতের নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে তাহাজ্জুদ নামাজের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। কোরআন ও হাদিসে রাতের ইবাদত এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনার বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
‘তাহাজ্জুদ’ শব্দের অর্থ হলো ঘুম থেকে জেগে ওঠা বা রাত জাগা। ইসলামি পরিভাষায়, রাতে ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে নফল নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তাহাজ্জুদ নামাজ বলা হয়।
তাহাজ্জুদ ফরজ নয়, এটি নফল ইবাদত। তবে মহানবী (সা.) নিয়মিত এ নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামও তা পালনে উৎসাহিত হয়েছেন।
তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আরবি নিয়ত মুখস্থ করা জরুরি নয়। অন্যান্য নফল নামাজের মতো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা অন্তরে রাখাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট।
চাইলে বাংলায় বলা যায়‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নফল নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি।’ তবে নিয়তের মূল বিষয় হলো অন্তরের সংকল্প; নির্দিষ্ট কোনো বাক্য উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়।
তাহাজ্জুদের সর্বনিম্ন রাকাত দুই। দুই রাকাত করে ইচ্ছা অনুযায়ী বেশি নামাজ আদায় করা যায়। মহানবী (সা.)-এর রাতের নামাজের রাকাতসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণনা রয়েছে।
তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যাকে তাহাজ্জুদের জন্য বাধ্যতামূলক মনে করা ঠিক নয়। কেউ দুই রাকাত পড়লেও তাহাজ্জুদ আদায় হবে।
তাহাজ্জুদ সাধারণ নফল নামাজের মতোই আদায় করতে হয়। প্রথমে অজু করে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে হবে। এরপর তাকবিরে তাহরিমা বলে নামাজ শুরু করতে হবে। সানা, সূরা ফাতিহা এবং এর সঙ্গে অন্য একটি সূরা বা কোরআনের কিছু আয়াত পড়তে হবে। এরপর রুকু ও সিজদা করে দ্বিতীয় রাকাত আদায় করতে হবে।
দুই রাকাত শেষে তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়ে সালাম ফেরাতে হবে। চাইলে এরপর আবার দুই রাকাত করে নামাজ আদায় করা যায়।
তাহাজ্জুদ নামাজে নির্দিষ্ট কোনো সূরা পড়া বাধ্যতামূলক নয়। যে সূরা বা আয়াত সহজে পড়া যায়, তা-ই পড়া যাবে।
তাহাজ্জুদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নামাজের পর মনোযোগ দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। নিজের প্রয়োজন, গুনাহের জন্য ক্ষমা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা যায়।
রাতের শেষ তৃতীয়াংশ দোয়া ও ইবাদতের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময় হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন এবং তাদের দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার প্রতি আহ্বান জানান। —সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৫৮।
তাহাজ্জুদ আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। রাতের নীরব সময়ে ঘুম ও আরামের সুযোগ ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়ানো বান্দার আন্তরিকতার প্রকাশ।
কোরআনে মুত্তাকিদের গুণাবলি বর্ণনা করতে রাতের ইবাদতের কথাও এসেছে। আল্লাহ বলেন, তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় কাটাত।’ - সূরা যারিয়াত, আয়াত ১৭।
তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা, গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হয়।
এশার নামাজের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রাতের নফল নামাজ পড়া যায়। তবে ঘুম থেকে উঠে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ আদায় করা উত্তম।
যে ব্যক্তি শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন বলে মনে করেন না, তিনি এশার পর ঘুমানোর আগে নফল নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে তাহাজ্জুদের প্রচলিত অর্থ অনুযায়ী, ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করাই উত্তম।
রাতের নামাজের শেষে বিতর আদায় করা উত্তম। কেউ যদি মনে করেন শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না, তাহলে এশার পরই বিতর পড়ে নিতে পারেন।
আর কেউ এশার পর বিতর পড়ে ঘুমানোর পর রাতে জেগে উঠলে তাহাজ্জুদ পড়তে পারবেন। তবে পুনরায় বিতর পড়তে হবে না।
তাহাজ্জুদ নফল নামাজ। অন্যদিকে ফজরের নামাজ ফরজ। তাই তাহাজ্জুদের কারণে কোনোভাবেই যেন ফজরের নামাজ ছুটে না যায়, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি।
রাতে বেশি সময় ইবাদত করার চেয়ে নিয়মিত ও সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করা উত্তম। তাই নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও ঘুমের প্রয়োজন বিবেচনা করে তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
উত্তর: হ্যাঁ। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে রাতের যেকোনো সময় তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়। তবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ উত্তম সময়।
উত্তর: হ্যাঁ। দুই রাকাত তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়। এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী দুই রাকাত করে আরও নামাজ পড়া সম্ভব।
উত্তর: না। সূরা ফাতিহার পর কোরআনের যেকোনো সূরা বা আয়াত পড়া যায়। নির্দিষ্ট কোনো সূরা পড়া বাধ্যতামূলক নয়।
হ্যাঁ। কেউ এশার পর বিতর পড়ে ঘুমানোর পর রাতে জেগে উঠলে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারেন। তবে পুনরায় বিতর পড়বেন না।
দোয়া কবুলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বা সময়সীমা নির্ধারিত নেই। বান্দার দায়িত্ব হলো আন্তরিকতার সঙ্গে দোয়া করা, ইবাদত করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।