

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় ভাজাপোড়া খাবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ স্বাভাবিক। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, সমুচা কিংবা বিভিন্ন তেলে ভাজা খাবার চোখে দেখলেই অনেকের আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়।
অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়া শরীরের জন্য উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে। তাই ইফতারে ভাজাপোড়া খেলে শরীরের কী কী ক্ষতি হয় এবং তার স্বাস্থ্যকর বিকল্প কী হতে পারে—এ বিষয়টি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সারাদিন রোজা রাখার ফলে শরীর একটি সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি না পাওয়ায় হজমতন্ত্র ধীর হয়ে যায়। এই অবস্থায় হঠাৎ করে অতিরিক্ত তেলযুক্ত ও ভারী ভাজাপোড়া খাবার খেলে পাকস্থলীর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ফলে গ্যাস্ট্রিক, বুকজ্বালা, বদহজম ও অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে ইফতারের পরপরই পেট ফাঁপা, অস্বস্তি কিংবা বমি ভাব শুরু হয়, যার মূল কারণ ভাজাপোড়া খাবারের অতিরিক্ত তেল ও চর্বি।
আরও পড়ুনঃ দাঁত তোলা বা দাঁতের ফিলিং করালে কি রোজা ভেঙে যায়?
ভাজাপোড়া খাবারে সাধারণত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। এসব চর্বি শরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। রমজানে নিয়মিত ইফতারে ভাজাপোড়া খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে, তাদের জন্য এটি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ইফতারে ভাজাপোড়া খাওয়ার আরেকটি বড় ক্ষতি হলো শরীরের পানিশূন্যতা বৃদ্ধি পাওয়া। ভাজাপোড়া খাবারে লবণ ও মশলার পরিমাণ বেশি থাকে, যা শরীর থেকে পানি টেনে নেয়। ফলে ইফতারের কিছুক্ষণ পর আবার তৃষ্ণা অনুভূত হয় এবং শরীর পর্যাপ্ত হাইড্রেশন ধরে রাখতে পারে না। এতে রাতে অস্বস্তি বাড়ে এবং পরদিন রোজা রাখা আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে। এছাড়া ভাজাপোড়া খাবার সাধারণত উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত হলেও পুষ্টিগুণে দরিদ্র। এতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের পরিমাণ কম থাকে। ফলে নিয়মিত ভাজাপোড়া খেলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয় এবং ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেকেই রমজান শেষে লক্ষ্য করেন, রোজা রাখার পরও তাদের ওজন বেড়ে গেছে, যার অন্যতম কারণ ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়া।
আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে সাপোজিটরি ব্যবহার করা যাবে কি?
ইসলামের দৃষ্টিতেও অতিভোজন ও ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।” (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৩১)। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়া শুধু অপচয়ই নয়, বরং শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যা ইসলামের মধ্যপন্থার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখন প্রশ্ন আসে, ইফতারে ভাজাপোড়ার পরিবর্তে কী খাওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর ইফতারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। ইফতার শুরু করা উত্তম খেজুর ও পানি দিয়ে, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত। খেজুর প্রাকৃতিক চিনি ও খনিজ সরবরাহ করে এবং দ্রুত শক্তি দেয়, আর পানি শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে।
আরও পড়ুনঃ সেহরিতে কী খেলে সারাদিন তৃষ্ণা কম পাবে?
এরপর ফলমূল, যেমন তরমুজ, পেঁপে, কমলা বা আপেল খাওয়া যেতে পারে, যা শরীরকে হাইড্রেট করে এবং হজমে সহায়তা করে। হালকা স্যুপ, ডাল বা সবজি দিয়ে তৈরি খাবার পাকস্থলীর ওপর কম চাপ ফেলে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়। ভাজা খাবারের পরিবর্তে সিদ্ধ, গ্রিল করা বা হালকা তেলে রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া স্বাস্থ্যসম্মত।
সবশেষে বলা যায়, ইফতারে ভাজাপোড়া খাওয়ার অভ্যাস সাময়িক তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর। গ্যাস্ট্রিক, হৃদরোগ, ওজন বৃদ্ধি ও পানিশূন্যতার মতো সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এই অভ্যাস। তাই রমজানকে শুধু ইবাদতের মাস নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। স্বাস্থ্যকর ইফতার বেছে নিলে শরীর ভালো থাকবে, রোজা রাখা সহজ হবে এবং ইবাদতেও মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে।
মন্তব্য করুন

