

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ও অংশীদার ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নানা আন্দোলন সংগ্রামে তার দাপটপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা এই প্রবীণ নেতা জীবনের শেষ সময়ে ছিলেন অনেকটাই আড়ালে। দীর্ঘ অসুস্থতার পর সোমবার ৮২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
একসময় ডাকসুর ভিপি হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া তোফায়েল আহমেদ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তরুণ বয়সেই জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে জায়গা করে নেন এবং বিভিন্ন মেয়াদে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল উত্থানে ভরা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় রাজনীতির বাস্তবতা বদলেছে। আওয়ামী লীগের ভেতরে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলেও নব্বইয়ের দশকের পর থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব নিয়ে দলীয় অঙ্গনে আলোচনা ছিল। বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের পর দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা আগের তুলনায় সীমিত হয়ে আসে বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ অন্যতম ছিলেন। পরবর্তী সময়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আশির দশকের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তোফায়েল আহমেদের এক ধরনের শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওই নেতারা বলেন, পঁচাত্তরে শেখ মুজিবকে স্বপরিবারে হত্যার ঘটনার পর তোফায়েল আহমেদ যদিও জেল খেটেছেন, কিন্তু সে সময় তিনি শক্ত অবস্থান নেন নি। এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের।
শেখ হাসিনা কয়েকবার বক্তব্যেও তার সেই ধারণা প্রকাশ করেছেন। এটি তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে শেখ হাসিনার শীতল সম্পর্কের একটি বড় কারণ ছিল বলে মনে করেন দলটির নেতাদের অনেকে।
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের ভেতরে সংস্কার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেখানে তোফায়েল আহমেদের নামও আলোচনায় আসে। ওই সময় দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে তিনি সাংগঠনিক সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
যদিও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ আবারও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ক্ষমতায় ফিরে আসে। এতে রাজনীতিতে কপাল পোড়ে সেই সংস্কারপন্থীদের। তোফায়েল আহমেদ দলে চিহ্নিত হন সংস্কারপন্থী হিসেবে এবং একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন দলীয় রাজনীতিতে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি একবার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পেলেও দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর প্রভাব আগের মতো ছিল না। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি মূলত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে ছিলেন এবং স্বাস্থ্যগত কারণেও সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক সহকর্মীরা বলছেন, নানা হতাশা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি দল ছাড়েননি কিংবা রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে আসেননি। ছাত্র আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনীতি, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একজন রাজনীতিক হিসেবে তাঁর নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
