

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আমরা আসলে কোন শেখ মুজিবকে স্মরণ করি, আর কোন মুজিবকে ইতিহাসের আড়ালে রেখে দিয়েছি বলে বিস্ফোরক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম।
শনিবার (১৫ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি এ প্রশ্ন করেন।
এনপিবি নিউজের পাঠকদের জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলমের পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
‘কোন শেখ মুজিবকে নিয়ে কেউ কেউ শোক করে? আবার কোন শেখ মুজিবের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রার্থনা করেছিল? এই দুইজন কি একই মুজিব? এটা এক জটিল ডিলেমা। একাত্তরে যে নায়ক, পঁচাত্তরে সে খলনায়ক।’
‘মুজিব এমনই বিপরীত গুণে ঠাসা চরিত্র। একাত্তরের সাত মার্চ পর্যন্ত যে মুজিব ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা এক রকম। আর বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের শেখ মুজিব আরেক রকম। এই দুই ভূমিকাকে নির্মোহভাবে না দেখলে আমরা আমাদের ফল্টলাইনগুলো আমরা অ্যাড্রেস করতে পারব না।’
‘পনেরোই আগস্টে নিঃসন্দেহে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বত্রিশ নম্বরে। একটা ছোট্ট শিশুকেও বাঁচতে দেওয়া হয়নি সেই রাতে। গোটা পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। যে কোনো বিবেকবান মানুষ এমনকি সবচেয়ে বড় অপরাধীকেও এভাবে পরিবারসমেত হত্যা করা হলে ব্যথিত হবেন।’
‘কিন্তু ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে তো একাত্তরের সাত মার্চের পরের দিনই পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট না। মাঝে তো বহু ঘটনা ঘটেছে, রক্ষীবাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে, লুটপাট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ইতিহাসের ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ হয়েছে যাতে প্রায় পনেরো লাখ লোক মারা গেছে বলে হিস্টোরিয়ানরা এখন বলছে, গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দুঃশাসনের হাত থেকে মুক্তির সব রাস্তা বন্ধ করা হয়েছে। এটা মাথায় না রাখলে তো আমরা বুঝতে পারবো না কোন ভয়াবহ জটিল পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ সেই মৃত্যুতে শোকার্ত হলো না। আপনি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর কী হয়েছে দেখেন। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে মাতম করলো!’
‘সমস্যা হলো শেখ মুজিবের বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পত্রিকা-ইতিহাস-কালচারাল ন্যারেটিভ দিয়ে এমনভাবে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এখন আর মনে করা কঠিন আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেন তার মৃত্যুতে শোকাহত হলো না। নব্বইয়ের পরে আমার তো মনে পড়ে না কোনো মেইনস্ট্রিম পত্রিকা বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরে ফোকাস করেছিল। এটা মুজিব হোয়াইটলিস্টিংয়েরই একটা প্রকল্প। যাতে আপনার যৌথ স্মৃতিতে শেখ মুজিব কেবল স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসাবেই থাকেন। আর আপনি গেয়ে উঠতে পারেন ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেতো বঙ্গবন্ধু মরে নাই’!’
‘ঐসময়ের বাস্তবতায় ‘বঙ্গবন্ধু’ মরে নাই শোনা গেলে, আমার আপনার মতো আরও হাজার হাজার মানুষ মারা যেতো, বিচারটাও হতো না। কারণ দেশে তখন শেখ মুজিবই ছিল আইন।’
‘এটা বুঝতে সুবিধা হবে হাসিনার আমলে যেভাবে হাসিনাই আইন ছিল সেটা মাথায় রাখলে।’
‘জুলাই প্রায় পুরোটা ক্যামেরার সামনে ঘটা বিপ্লব। জুলাই-পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল আর্কাইভিং, জুলাই জাদুঘরের সৃষ্টি, আর ষোলো বছরের দুঃশাসন নিয়ে বানানো অসংখ্য ডকুমেন্টারির কারণে মিডিয়া চাইলেও আর হাসিনার অপরাধ ধুয়ে মুছে সাফ করতে পারবে না। নাহলে হয়তো আজ থেকে দশ বছর পরে কেউ একজন এসে গান লিখতো- ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেতো, শেখ হাসিনা পালায় নাই’। আর তারও দশ বছর পর কোনো এক নিষ্পাপ কিশোর এসে সেই গান শুনে বিমোহিত হয়ে যেতো। তারও দশ বছর পর হয়তো সে নিষ্পাপভাবেই ফেসবুকে লিখতো, লও লও লও সালাম।’
‘ফলে আমাদের কালেকটিভ হিলিংয়ের জন্য দরকার সাত মার্চ-পূর্ববর্তী এবং বাহাত্তর-পরবর্তী মুজিবের নির্মোহ মূল্যায়ন। এটা যদি আমরা করে থাকতাম তাহলে শেখ মুজিবকে আইকন বানিয়ে হাসিনা আমাদের হাজার হাজার ভাই-বোনকে খুন-গুম করতে পারতো না।’
‘সপরিবারে খুন হওয়া শেখ মুজিবের জন্য শোক, বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরে খুন হওয়া সকল বাংলাদেশীর জন্য শোক।’

