সোমবার
৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইলেক্ট্রো-মেডিক্যাল ডিপ্লোমাধারীদের কর্মসংস্থান: রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?

আশ্রাফুল  আলম
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০২ পিএম
expand
ইলেক্ট্রো-মেডিক্যাল ডিপ্লোমাধারীদের কর্মসংস্থান: রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?

বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধুনিক চিকিৎসা-প্রযুক্তির ব্যবহার। আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবরেটরি ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট। কিন্তু এসব যন্ত্র পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি নির্ণয় ও সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ টেকনিক্যাল জনবলের কাঠামো এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত।

অন্যদিকে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সরকারি তথ্যেও বিভিন্ন পলিটেকনিকে ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা আসন থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র যখন এই বিষয়ে শিক্ষার্থী তৈরি করছে, তখন তাদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত ও সুস্পষ্ট কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কোথায়?

হাসপাতালের মূল্যবান যন্ত্র, কিন্তু পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল জনবল নেই

সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন করা হলেও সেগুলোর নিয়মিত preventive maintenance, calibration, troubleshooting ও repair-এর জন্য বিশেষায়িত জনবল প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Facility Registry-তে কোনো কোনো সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামোয় “Electro Medical Equipment Technician” পদ দেখা যাচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী এ পদে ৮টি পদ অনুমোদিত থাকলেও সেখানে কর্মরত জনবল শূন্য দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় পদ থাকার পরও যদি পদগুলোতে জনবল না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থে কেনা চিকিৎসা-যন্ত্রপাতির কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে নিশ্চিত হবে—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্য একটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জনবল তথ্যেও Medical Engineer (Equipment) এবং Medical Engineer (Electronic/Electric)-এর মতো পদ পাওয়া যায়।

এতে স্পষ্ট হয়, স্বাস্থ্য খাতে মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সরকারি কাঠামোর অজানা বিষয় নয়। সমস্যা হচ্ছে পদ সৃষ্টি, নিয়োগ, যোগ্যতা নির্ধারণ এবং ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সুস্পষ্ট career pathway-এর সমন্বিত কাঠামো।

তাহলে ইলেক্ট্রো-মেডিক্যাল ডিপ্লোমাধারীদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

একজন ডিপ্লোমা ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল প্রযুক্তিবিদ সাধারণত বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিক্স, পরিমাপ ও চিকিৎসা-যন্ত্রপাতির প্রযুক্তিগত বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন যন্ত্রের installation, operation support, preventive maintenance এবং basic troubleshooting-এ তাদের দক্ষতা কাজে লাগানো সম্ভব।

তাই সরকারি হাসপাতালগুলোতে Medical Equipment Technician/Biomedical Equipment Technician ধরনের টেকনিক্যাল পদে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যুক্তিসঙ্গত।

বিশেষ করে—

মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিশেষায়িত হাসপাতাল, সরকারি ডায়াগনস্টিক ও ল্যাবরেটরি, সরকারি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্য প্রকৌশল ও হাসপাতাল অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুযায়ী মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিট গড়ে তোলা যেতে পারে।

রাষ্ট্রের বিনিয়োগের সুরক্ষাও জরুরি

এটি শুধু চাকরির প্রশ্ন নয়; এটি সরকারি সম্পদ রক্ষার প্রশ্নও।

একটি হাসপাতালের ICU বা অপারেশন থিয়েটারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র নষ্ট হলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। মেরামতের জন্য বিদেশি কোম্পানি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে ব্যয়ও বাড়তে পারে।

দেশে প্রশিক্ষিত ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল টেকনিশিয়ান তৈরি করে তাদের সরকারি ব্যবস্থায় কাজে লাগানো গেলে একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, সরকারি যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা—তিনটি ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া সম্ভব।

রাষ্ট্রের করণীয় কী?

১. পৃথক পদ সৃষ্টি ও দ্রুত নিয়োগ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক Electro Medical Equipment Technician/Biomedical Equipment Technician পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দিতে হবে।

২. নিয়োগবিধিতে যোগ্যতা স্পষ্ট করা

ডিপ্লোমা ইন ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা কোন কোন সরকারি পদে আবেদন করতে পারবেন—নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তা স্পষ্ট করতে হবে।

৩. প্রতিটি বড় হাসপাতালে Equipment Maintenance Unit

মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা পর্যায়ের বড় হাসপাতালগুলোতে পৃথক Medical Equipment Maintenance Unit চালু করা যেতে পারে।

৪. উপজেলা পর্যায়ে টেকনিশিয়ান নিয়োগ

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও আধুনিক যন্ত্রপাতি বাড়ছে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়েও টেকনিশিয়ান নিয়োগ জরুরি।

৫. ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা

ডিপ্লোমা শেষে সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে ৬–১২ মাসের বাস্তবভিত্তিক ইন্টার্নশিপ চালু করা যেতে পারে।

৬. উচ্চশিক্ষার পথ খুলে দেওয়া

ডিপ্লোমাধারীদের জন্য Biomedical Engineering, Medical Equipment Technology বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও credit transfer-এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

৭. দক্ষতার জাতীয় মান নির্ধারণ

মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ের টেকনিশিয়ান কী কাজ করবেন—তার জাতীয় competency standard নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

সরকার যদি পলিটেকনিক পর্যায়ে ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল প্রযুক্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করে দক্ষ জনবল তৈরি করে, তাহলে সেই জনবলকে স্বাস্থ্য খাতে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা কি একই সঙ্গে করা হচ্ছে?

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সরকারি পলিটেকনিকগুলোতে ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল প্রযুক্তির শিক্ষা চালু রয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনবল কাঠামোতে Electro Medical Equipment Technician-এর মতো পদও দেখা যাচ্ছে।

তাই এখন প্রয়োজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়/কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়/স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা।

উপসংহার

ইলেক্ট্রো-মেডিক্যাল ডিপ্লোমাধারীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নন; তারা দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি জনশক্তি হতে পারেন।

রাষ্ট্র যদি সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে এই ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সুস্পষ্ট সরকারি চাকরির পথ তৈরি করা সময়ের দাবি।

সরকারি অর্থে চিকিৎসা-যন্ত্র কেনা হবে, কিন্তু সেই যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল থাকবে না—এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এখন প্রয়োজন শুধু নতুন পদ সৃষ্টি নয়; প্রয়োজন ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল ডিপ্লোমাধারীদের জন্য স্বীকৃত পদ, নিয়োগবিধি, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্থায়ী কর্মসংস্থানের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো।

প্রতিবেদনের অনুসন্ধানী প্রশ্ন:“যে রাষ্ট্র দক্ষ ইলেক্ট্রোমেডিক্যাল প্রযুক্তিবিদ তৈরি করছে, সেই রাষ্ট্রই কি তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত?”

লেখক: আশ্রাফুল আলম

সাংবাদিক

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন