বৃহস্পতিবার
১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্তানের নৈতিক শিক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা এবং মা বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব 

শেখ ফরিদ উদ্দিন
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
শেখ ফরিদ উদ্দিন
expand
শেখ ফরিদ উদ্দিন

বর্তমান সমাজে একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক চিত্র হলো বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা। যে মা-বাবা নিজের জীবনের সব সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলেন, শেষ বয়সে এসে অনেককেই সেই সন্তানের অবহেলার শিকার হতে হয়, এমনকি ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যাওয়া অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা মা নুর জাহান বেগমের মৃত্যুকে ঘিরে মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। রাষ্ট্রের প্রচলিত পিতা মাতার ভরণপোষণ আইনে মা বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব অবহেলার কারনে মৃতের এক সন্তান সরকারের যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে ওএসডি করা হয়েছে।

আধুনিক সভ্যতার যুগে এই সামাজিক ব্যাধির পেছনে কী কী কারণ রয়েছে এবং সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে মা-বাবার দায়িত্ব কী—তা ইসলাম ও কোরআন-হাদিসের আলোকে নিচে আলোচনা করা হলো।

১. মা-বাবার প্রতি অবহেলার মূল কারণসমূহ: আজকের তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে মা-বাবার প্রতি যে উদাসীনতা দেখা যায়, তার পেছনে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে

নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাব: আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও অনেক সন্তান ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরকালীন জবাবদিহিতা এবং মা-বাবার অধিকার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকা এর অন্যতম প্রধান কারণ।

বস্তুবাদী মানসিকতা: বর্তমান যুগে মানুষ অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যারিয়ার, টাকা-পয়সা এবং বস্তুগত সুখের পেছনে ছুটছে। ফলে অন্ধ স্বার্থপরতা মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধকে ভুলিয়ে দিচ্ছে।

অপসংস্কৃতি ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব: যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠনের প্রবণতা এবং "ব্যক্তিগত স্বাধীনতা"র অতি আধুনিক ধারণা অনেককে মা-বাবাকে বোঝা মনে করতে বাধ্য করছে।

শৈশবে মা-বাবার সঠিক প্যারেন্টিংয়ের অভাব: অনেক সময় মা-বাবা সন্তানকে ক্যারিয়ারে সফল করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাকে একজন ভালো মানুষ বা আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার দিকে নজর দেন না। শৈশবে ভালোবাসার পাশাপাশি যে নৈতিক শিক্ষার বীজ বপন করার কথা ছিল, তা না করার ফলে শেষ বয়সে এসে মা-বাবাকে এই পরিণতি ভোগ করতে হয়।

২. সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া: ইসলামের আলোকে মা-বাবার দায়িত্ব ও কর্তব্য ইসলাম মনে করে, সন্তানকে কেবল খাইয়ে-দাইয়ে বড় করাই মা-বাবার একমাত্র কাজ নয়; বরং তাকে সৎ ও নৈতিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল, সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহীহ বুখারী)

৩. সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে মা-বাবার করণীয়সমূহ:

উত্তম আদর্শ হওয়া: সন্তানরা উপদেশ শোনার চেয়ে মা-বাবার আচরণ দেখে বেশি শেখে। মা-বাবা যদি নিজেরা নিজেদের মা-বাবার (সন্তানের দাদা-দাদী) প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হন, তবে সন্তানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই নৈতিকতা শিখবে।

শৈশব থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া: কোরআনে লোকমান হাকিমের একটি বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে, যেখানে তিনি তার সন্তানকে শৈশবেই কিছু মৌলিক নৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার সন্তানকে বলল—হে বৎস, আল্লাহর সাথে কোনো শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।’ (সূরা লোকমান: ১৩)

এরপর তিনি সন্তানকে নামাজ কায়েম করা, সৎ কাজের আদেশ দেওয়া, অসৎ কাজে নিষেধ করা এবং মানুষের সাথে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে কথা না বলার শিক্ষা দিয়েছিলেন।

হালাল উপার্জন দিয়ে লালন-পালন: সন্তানের স্বভাব-চরিত্রের ওপর হালাল খাদ্যের গভীর প্রভাব রয়েছে। হারাম উপার্জনে বড় হওয়া সন্তানের মধ্যে অবাধ্যতা এবং নৈতিক স্খলন ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই মা-বাবার কর্তব্য সন্তানকে সম্পূর্ণ হালাল রিজিকে বড় করা।

৪. মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও মর্যাদা: কোরআন-হাদিসের কড়া হুঁশিয়ারি ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের পরেই মা-বাবার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মা-বাবার অবাধ্য হওয়া বা তাদের অবহেলা করা কবিরা গুনাহ।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)

জান্নাত ও জাহান্নামের ফায়সালা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মা-বাবাই হলো তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।’ অর্থাৎ, তাদের সন্তুষ্টিতে জান্নাত এবং তাদের অসন্তুষ্টিতে জাহান্নাম।

বার্ধক্যে অবহেলার শাস্তি: রাসুলুল্লাহ (সা.) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনবার বলেছিলেন, ‘তার নাক ধুলায় ধূসরিত হোক!" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! কার?’

তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে অথবা একজনকে বার্ধক্যে পেল, অথচ (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (সহীহ মুসলিম)

সবশেষে বলতে পারিআজকের সন্তানই আগামী দিনের মা-বাবা। আমরা আজ আমাদের মা-বাবার সাথে যে আচরণ করব, আমাদের সন্তানরাও আমাদের সাথে ঠিক একই আচরণ করবে—এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

তাই মা-বাবার প্রতি অবহেলা দূর করতে হলে পরিবার থেকেই নৈতিকতার চর্চা শুরু করতে হবে। সন্তানকে শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা জাঁকজমকপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে না ছুটিয়ে, সবার আগে একজন আদর্শ ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবেই সমাজ থেকে এই অবক্ষয় দূর হওয়া সম্ভব।

লেখক : শেখ ফরিদ উদ্দিন, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Uzbekistan VS Colombia
Scheduled
18 Jun, 08:00 AM
VS
World Cup