শনিবার
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাসকগোষ্ঠী দেয়ালের লেখা পড়ে না

মেজর (অব.) মনজুর কাদের
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
মেজর (অব.) মনজুর কাদের
expand
মেজর (অব.) মনজুর কাদের

১৯৬৮-৬৯ এর আন্দোলনের সময় শহরগুলোর দয়ালে আলকাতরা (কালো রং) দিয়ে সরকার বিরোধী শ্লোগান/বক্তব্য লেখা হতো। এই দেয়াল লিখনির নাম দেয়া হয়েছিল: 'চিকা মারা'। বিপ্লবী নেতা সিরাজ সিকদার এর বোন সে সময়ে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দেয়ালে চিকা মেরে দুঃসাহসীকতা দেখিয়েছিলেন। এরপর থেকে সব সরকারের বিরুদ্ধে দেয়ালে চিকা মারা হতো।

আধুনিক সময়ে পাকা দেয়ালে (ওয়াল) লেখা/চিকা মারার পরিবর্তে এলো ফেসবুক ওয়াল। এই দেয়ালের লেখার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা চরম নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন বলেই আজ তিনি ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যু দন্ড প্রাপ্ত আসামি। বাদি এখন আসামিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—ক্ষমতা মানুষকে যেমন শক্তিশালী করে, তেমনি অনেক সময় তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নও করে ফেলে। “শাসকগোষ্ঠী দেয়ালের লেখা পড়ে না”—এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটি আসলে সেই বাস্তবতারই এক গভীর প্রতিফলন।

দেয়ালের লেখা বলতে এখানে বোঝানো হয় সময়ের সতর্ক সংকেত—জনগণের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা। এই সংকেতগুলো কখনো সরাসরি শোনা যায় প্রতিবাদে, কখনো দেখা যায় নীরব ক্ষোভে, আবার কখনো প্রকাশ পায় ভোটের আচরণে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ক্ষমতাসীনরা এসব সংকেতকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো অস্বীকার করতে শুরু করে।

প্রতিটি রাষ্ট্রেই শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। যখন সেই আস্থার জায়গায় অবিশ্বাস জন্ম নেয়, তখন ধীরে ধীরে শাসক ও শাসিতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এই দূরত্ব যদি সময়মতো কমানো না হয়, তাহলে তা একসময় বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে শাসকগোষ্ঠী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানকে নিরাপদ ভেবেছে—কিন্তু বাস্তবে তারা ছিল পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে।

সমস্যার মূল কারণ প্রায়ই একই—অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, সমালোচনা গ্রহণে অনীহা, এবং ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা। যখন শাসকগোষ্ঠী শুধুমাত্র নিজেদের অনুগতদের মতামত শোনে, তখন তারা একটি “তথ্য বুদবুদ”-এর মধ্যে আটকে যায়। ফলে বাস্তবতার সাথে তাদের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।

দেয়ালে লেখা তখনও থাকে, কিন্তু তা পড়ার চোখ আর থাকে না। অন্যদিকে, বিচক্ষণ নেতৃত্ব সবসময় সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেয়। তারা জানে, জনগণের ছোট ছোট অসন্তোষই বড় সংকটের পূর্বাভাস হতে পারে। তাই তারা সংলাপের পথ খোলা রাখে, সমালোচনাকে শত্রু নয় বরং সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখে, এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগত পরিবর্তন আনে।

এই ধরনের নেতৃত্বই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত। ফলে “দেয়ালের লেখা” এখন আর শুধু দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই—এটি ছড়িয়ে আছে সংবাদমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, জনমতের প্রতিটি স্তরে।

তাই আজকের শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সংকেতগুলোকে সঠিকভাবে পড়া এবং সময়মতো প্রতিক্রিয়া জানানো। শেষ পর্যন্ত, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ইতিহাসে একটি সরকারকে সম্মানিত করে বা ব্যর্থতার উদাহরণে পরিণত করে। দেয়ালের লেখা সবসময়ই থাকে; প্রশ্ন হলো, শাসকগোষ্ঠী সেটি পড়তে চায় কি না।

উল্টো পথে হাঁটার জন্য প্রতিবাদ

সরকারের সমালোচনা করার অভিযোগে বাংলাদেশে চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল, প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন সরকারকে নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করার কারণে এই গ্রেপ্তার পূর্ববর্তী সরকারের দমনমূলক চর্চার উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিবৃতিটিতে বলা হয়, বিএনপি সরকারের উচিত মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করা, ভিন্নমত দমনে বিদ্যমান আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা এবং অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে এমন ধারাগুলো সংশোধন বা বাতিল করা।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে ব্যাপক বিজয়ের মাধ্যমে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বর্তমান সরকার গঠিত হয়। ইতিপূর্বে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দমন করতে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়।

সংস্থাটির ডেপুটি এশিয়া ডিরেক্ট মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের দাবিতে বাংলাদেশিরা জীবন ঝুঁকিতে ফেলার পর নতুন সরকারের সংস্কার আনার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি সরকার অপছন্দের কনটেন্ট পোস্ট করার অভিযোগে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের গ্রেপ্তার করছে—এটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক।’!

প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভব হ‌ওয়ায় সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্য।

তাই দেয়ালের লেখা পড়ে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করাই শ্রেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

লেখক: সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) মনজুর কাদের।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন