


একজন উপবাসী মানুষের কাছে এক মুঠো ভাতের অনেক মূল্য। পিপাসায় কাতর একজন লোকের কাছে এক গ্লাস পানির অনেক দাম। তেমনি ভোটের ক্ষুধায় কাতর একটা জাতির কাছে ভোটের গুরুত্ব সীমাহীন।
কারণ ভোট দানের মাধ্যমে জাতি তার নাগরিক অধিকার লাভ করে এবং ব্যক্তি ভোট দানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনায় পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। এটা তার পরিচিতি, এটা তার সম্মান।
আপনি যে সমাজে বাস করেন সেই সমাজের লোকরা যদি আপনাকে গুরুত্ব না দেয়, সম্মান না দেখায় তাহলে আপনার ওখানে বসবাস খুব কষ্ট হবে। তখন আপনি হয়ত সে সমাজ ছেড়ে চলে যাবেন অথবা সেখানে শক্তি প্রদর্শন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন। তা না হলে আপনার জীবন বিপন্ন হবে এবং সম্মান ও সম্পদ হারানোর আশঙ্কা দেখা দিবে।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে সম্মানী লোকরা প্রথমে রাজনীতি ত্যাগ করে। পরবর্তীতে তারা দেশত্যাগের পরিকল্পনা করে। তাদের কাছে রাজনীতি মানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের কর্তৃত্ব, তাদের দুর্ব্যবহার এবং অন্যায় অপরাধে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ। উঁচু পর্যায়ের সম্মানীয় ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে রাজনীতি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাতে থাকেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতন হলে সব কিছুর হিসাব নিকাশ পাল্টে যায়। সবকিছুর চেহারা বদলে যায়।
বিগত ১৭ বছর তারা ভোট দিতে পারেনি, স্বাভাবিক বাঁচার নিশ্চয়তা ছিলনা। পরিবর্তনের ফলে আরও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। এরপর তাদের ভোটের আকাঙ্ক্ষাও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এতদিন তারা মাথা উঁচু করে চলতে পারেনি। কথা বলতে পারেনি।
পরিবর্তনের পরে তারা মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। আগে বাকস্বাধীনতা ছিল না, পরিবর্তনের পর প্রাণখুলে কথা বলার চেষ্টা করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির ছিল, পরিবর্তনের পরে দেশের মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন পরিকল্পনা করছে। উপর মহল থেকে নিচ মহল পর্যন্ত সবাই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
দেশের নাগরিকদের মধ্যে যাদের বয়স ৩৫ এর নিচে তারা জীবনে একটাও ভোট দিতে পারেনি। অথচ এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ উচ্চ রাজনীতি সচেতন। ভোট দিতে না পারলে তাদের এই সচেতনতার কোনোই মূল্য থাকে না।
আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলছি নামাজে এবং ভোটের বেলায় সমাজের উঁচু-নিচু সব একাকার হয়ে যায়। সবাই সমান হয়ে যায়। কারণ ভোটের দিন ধনী নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মালিক শ্রমিক, ছাত্র শিক্ষক, বিচারক আসামি, সাধু-চোর সবাই এক সারিতে দাঁড়ায়।
সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়। নামাজের সময়ও রাজা ভিখারী পাশাপাশি দাঁড়ায়। নামাজও ধনী দরিদ্র সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসে। ভোটের বেলায় প্রত্যেকে একটা করে ভোটের মালিক। চাই সেই ব্যক্তি যত ক্ষমতাধর বা ক্ষমতাহীন হোন না কেন।
অনেক অনেক বছর পর দেশের মানুষ ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছ। বছরে দুইবার ঈদ হয়। সেই ঈদে ঢাকাসহ বড় বড় শহর ফাঁকা হয়ে যায়। ঈদ হচ্ছে মুসলমানদের বৃহৎ উৎসব। অন্যান্য ধর্মাবলীনদেরও বড় ধর্মীয় উৎসব থাকে। সে উৎসব উপলক্ষেও রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ সেজন্য ঈদের প্রভাব চোখে পড়ার মতো। ঈদ উৎসব পালন করার জন্য শহরের লোকরা গ্রামে চলে যায়।
পত্রিকা ওয়ালারা একে বলে 'নাড়ীর টান'। অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম শহরে বেড়ে উঠলেও তাদের আসল ঠিকানা গ্রাম। তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি গ্রামে। সেজন্যে ঈদউৎসব পালন করার উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষ শিশু বালক বালিকা নির্বিশেষে প্রায় সবাই গ্রামে চলে যায়।
তাছাড়া ঈদ উপলক্ষে ছুটিও তাকে বেশি। তিন দিনের ছুটি হলেও তারা কাটিয়ে আসে এক সপ্তাহ। ফলে শহরগুলি একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। একইভাবে ভোটের কারণে মহাব্যস্ততম নগরী ঢাকায় বিরাজ করে শুনসান নীরবতা।
বলতে কি গত প্রায় এক পক্ষ কাল ঢাকার অবস্থা ঈদের ছুটির মতই। মানুষের মুখে যেন আনন্দ ধরে না। তাদের শরীর জানান দেয় তারা খুব ভালো আছে। সামনে আরো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। ভালোর জন্য দরকার ভোট।
ভোট পেয়ে যারা নির্বাচিত হবেন তারাই সুষ্ঠুভাবে দেশ চালাবেন। এই উদ্দেশ্যেই শহরের ভাসমান মানুষরা আগেভাগেই গ্রামে চলে গেছে। এমনকি যাদের নিজেদের বাসা বাড়ি আছে তারাও তাদের প্রিয় প্রার্থীর পক্ষে ক্যাম্পেইন করার জন্য নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে গেছে। অবশ্য ঢাকায়ও ভোট হচ্ছে। ঢাকায় যারা ভোটার তাদের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি না।
এ কারণে তাদের গেদারিং চোখে পড়ে না। রাস্তায়ও যানজট হয় না। যানবাহনও অপ্রতুল। মহাজ্যামের রাস্তা গুলশান বনানী রামপুরা বাংলামটর লালবাগ মালিবাগ মহাখালী কাওরান বাজার কাপ্তানবাজার গুলিস্তান আজিমপুর মোহাম্মদপুর ধানমন্ডি সর্বত্র একই অবস্থা। কোথাও রাস্তায় তেমন ভীড় নেই। জ্যাম থাকার তো প্রশ্নই উঠে না। যে পথ অতিক্রম করতে জ্যামের কারণে ২ ঘণ্টা লাগতো সে পথ এখন ১৫-১৬ মিনিটেই অতিক্রম করা যায়।
নতুন ভোটার ৪ কোটি। তরুণ তরুণীদের অন্তর জুড়ে উচ্ছ্বাস উন্মাদনা। তারা এবার নতুন প্রজন্মের প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে ভোট দেবে। তাদের চোখে মুখে আবেগ আনন্দ। তাদের শরীরের ভাষাও অন্যরকম।
এতদিন তারা ভোটের কথা শুনেছে। টেলিভিশনে দেখেছে ভোট হচ্ছে। কিন্তু কারো ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ হয়নি।
ফ্যাসিবাদ ও তাদের দোসররা ভোটারদের বলতো তাদের ভোটকেন্দ্রে যাবার দরকার নেই। কেউ গেলেও বলতো আপনার ভোট হয়ে গেছে। লীগের দলীয় পান্ডারা দিনের ভোট রাতের অন্ধকারেই দিয়ে দিতো। ডাকাত যেমন রাতের অন্ধকারে আসে, তেমনি দলীয় সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারেই মানুষের অধিকার কেড়ে নিতো।
দেশের মানুষের অধিকার অন্যের কব্জায় চলে গিয়েছিল বলে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ডাকাত-অসুরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। দীর্ঘ সে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে অবশেষে দেশের আপামর জনতা সফল হয়। সে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার তাদের ভোট।
আমাদের লিডার তারেক রহমান আগেই বলেছিলেন 'দেশ যাবে কোন পথে/ফয়সালা হবে রাজপথে'। এটি একটি স্লোগান হলেও এটিই হয়ে পড়ে গণতন্ত্রকামীদের কাছে ফ্যাসিস্ট হটানোর মূল দর্শন। এই দর্শন অনুসরণ করেই তারা দেশ থেকে স্বৈরাচার তাড়াতে সক্ষম হয়।
একটা জাতির দুই দশকের কাঙ্খিত ভোট। অনেক অপেক্ষা, অনেক অনেক কষ্টের ভোট এটি। এই ভোট তারা কোনভাবেই মিস করতে চায় না। তরুণ প্রজন্মের কান্ডারী তারেক রহমান দেশের মানুষের হৃদয় কেড়ে নিয়েছেন।
তিনি যে জনসভায় যাচ্ছেন, যে পথ দিয়ে হাঁটছেন, সর্বত্র লাখ লাখ জনতার উপস্থিতি সবাইকে বিমোহিত করে। যারা ভোটার তারা তো সমাবেশে হাজির হচ্ছেনই, যারা ভোটার নন বা ভোটদানের বয়সে পৌঁছেননি তাদের আবেগও বাঁধভাঙ্গা জলোচ্ছ্বাস সুনামির মত।
আমি বলবো তারেক রহমানের উপস্থিতি মানে এক একটি মানবসুনামি। জনসমাবেশে কোন মানুষকে ডেকে আনার দরকার হয়না। তারা নিজেরাই নিজেদের আগ্রহে পথসভায় সমবেত হয়েছেন। দেখতে দেখতে সেই পথসভাও লাখো জনতার সমাবেশে পরিণত হয়। রাস্তাঘাট, হাট বাজার, পাড়া মহল্লা, মাঠ ময়দান পূর্ণ হয়ে যায়। সকলের মুখে একই স্লোগান 'ভোটটা দিবেন কিসে/ধানের শীষে'।
ইতোমধ্যে তারেক রহমানের পক্ষে প্রচারে অবতীর্ণ হয়েছেন তিন নারী। তারা হলেন জোবাইদা রহমান, শর্মিলা রহমান ও জাইমা রহমান। তাদের প্রভাব পড়েছে দেশের সকল প্রান্তে, সকল ভোটারের ঘরে ঘরে। তাদের দেখাদেখি বিএনপি'র সকল প্রার্থীর আত্মীয়-স্বজনরাও এখন মাঠে ময়দানে চষে বেড়াচ্ছে।
তারাও ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের এতে আনন্দের সীমা নেই। যে লোককে তারা সচরাচর দেখতে পেতো না, যাকে মনে মনে ভাবতো গ্রেট হিরো, চামড়ার চোখে একবার দেখার জন্য অন্তরে ছিল আকুলতা, সেই সম্মানিত সম্ভ্রান্ত লোকরাই এখন সকাল সন্ধ্যায় ভোটের জন্য ধরনা দেয়।
ভাবা যায়! এতদিন বিএনপি এমনটাই চেয়েছিল। তারা ক্ষমতা চায়নি। চেয়েছে মানুষের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার। আজ দেশের সর্বত্র মানুষের সেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত। সবাই প্রহর গুনছে কখন ১২ই ফেব্রুয়ারি আসবে, কখন তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জীবন ধন্য করবে।
গতকাল ঢাকার একটি নির্বাচনী পথসভায় হাজির ছিলাম। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ক্যান্টনমেন্টের ইসিবি চত্বরে তারেক রহমান আসবেন। তিনি অত্র এলাকার মানুষের নিকটজন। বহুকাল আগ থেকে তিনি তাদের সাথে পরিচিত।
এই ক্যান্টনমেন্টেই ছিল তার বাড়ি বাসা। এখানকার আলো বাতাসে বেড়ে উঠেছেন। এই কচুক্ষেত, মানিকদি, মাটিকাটা, ভাষানটেক ছিল তার বাড়ির পাশের এলাকা। সেই এলাকার মানুষ নিত্যই তাকে দেখেছে। এবার এ অঞ্চল তার নিজের নির্বাচনী এলাকা।
সেই নির্বাচনী এলাকায় একটা পথসভা হতে যাচ্ছে। বাড়ির কাছের এলাকার পথসভাটিও ছিল চোখে পড়ার মতো। আজ এরকম ছয়টি স্থানে তার পথসভা। হয়তো শেষ হবে রাত ১২টা বেজে যাবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম সেই সকাল থেকে লোকজন তাদের কাজ ফেলে সভাস্থলে এসে অপেক্ষা করছে। তার এক-একটা পথসভা মানে লাখো মানুষের সমাবেশ।
শুধু চট্টগ্রাম বরিশাল খুলনা রাজশাহী নয়, তারেক সুনামিতে উচ্ছসিত উদ্বেলিত ছাত্র শিক্ষক জনতা। তারেক রহমানকে কাছে থেকে এক পলক দেখার জন্য সবাই ভিড় জমাচ্ছেন রাস্তাঘাটে পথে প্রান্তরে। তাদের মনোভাব হল সারা বছর পয়সা কামাই।
আজ আমরা তারেক রহমানকে কাছে থেকে দেখতে চাই! তার দুটো কথা শুনে প্রাণ জুড়াই। গণমানুষের এই আবেগ এত বালাসার কি কোন তুলনা হয়!
তারেক সুনামিতে যে কেবল মানুষের আবেগ উচ্ছ্বাস বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তাই নয়, পাশাপাশি তার আবির্ভাবে চক্রান্তকারীদের সকল চক্রান্ত ষড়যন্ত্রও ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মন্তব্য করুন