বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মাদকের আগ্রাসন: সামাজিক দায়বদ্ধতা

জাকির হোসেন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
জাকির হোসেন
expand
জাকির হোসেন

যে ইস্যুটি নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি সেটি শুধু বাংলাদেশেরই নয়; সারা বিশ্বেরই সমস্যা। জঙ্গিবাদ যেমন সারা বিশ্বের সমস্যা, তেমনি মাদকও পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেরই প্রধান সমস্যা। যারা মাদক নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন বা এর কুফল নিয়ে গবেষণা করছেন; তাদের অভিমত মাদক কোন সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আর এই নিয়ন্ত্রণে আইনী ব্যবস্থার সাথে সাথে চাই সামাজিক সচেতনতাও। আমরা মাদককে এভাবে চিনতে পারি- যে দ্রব্য গ্রহণে মানুষের ভেতরে আসক্তি জন্মে তারই নাম মাদক দ্রব্য। মাদকাসক্তি এক নীরব মরণ ব্যাধি।

সমাজ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে মাদক গ্রহণ একটি বদাভ্যাস, একটি আচরণগত সমস্যা। আবার চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মাদকাসক্তের স্বাস্থ্য হানি হয়, জীবনীশক্তি কমতে থাকে, শরীরের ইন্দ্রীয়গুলো নিস্তেজ হয়ে যায়, বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়, মানসিক ভারসাম্য লোপ পায়, কর্মদক্ষতা ও ক্ষমতা গ্রাস পায়, হতাশা এবং অবসাদ তাকে ঠেলে দেয় এক অন্ধকার জীবনে। সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলে।

কোন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলে তার মধ্যে নানা রকম পরিবর্তন দেখা দেয়। এসব পরিবর্তনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: দৈহিক পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন, মানসিক পরিবর্তন, বোধশক্তিতে পরিবর্তন, কাজে-কর্মে পরিবর্তন ইত্যাদি। মাদকাসক্তি অপরাধ নয়, এটা একটা রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি তাই কোন অপরাধী নয়, একজন রোগী।

মাদকাসক্তির অভিশাপে নিমজ্জিত এখন গোটা পৃথিবী। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা আজ কোন দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধা নেই। সমগ্র বিশ্ব এ সমস্যার সম্মুখীন। বাংলাদেশও এই সমস্যায় জর্জরিত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর যে দু'টি দেশের সাথে আমাদের সীমানা রয়েছে সেই দু'টি দেশ থেকেই আমাদের এখানে মাদক দ্রব্য ঢুকছে।

গবেষকদের দৃষ্টিতে মাদকাসক্তের কারণ বহুবিধ। উঠতি বয়সীর তরুণরা নেশা করে কৌতূহল বশত, বন্ধুদের প্ররোচনায় অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে, বাবা-মার অসুখী দাম্পত্য জীবনের কারণে অনেক হতাশাগ্রস্ত তরুণ নেশা করে থাকে, পাড়া-মহল্লার ক্লাবের আড্ডা থেকেও মাদকাসক্তির বিস্তৃতি ঘটে, কর্মবিমুখিতা ও ভ্রান্ত জীবনদর্শন, অপসংস্কৃতি ও অসৎ সঙ্গের প্রভাব, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তার অভাব, মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা, বেকারত্ম, অত্যাধুনিক সাজগোজের প্রবণতা ও স্মার্ট হওয়া সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভের অদম্য আকাক্সক্ষা ইত্যাদি মাদকাসক্তির কারণ। মাদকাসক্তদের অধিকাংশই কিশোর অথবা যুবক।

এই মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রত্যেকের অবস্থান থেকে কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। এটি কেবল সরকার আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ছেড়ে দিলেই চলবে না। আমরা যারা সমাজে বাস করি প্রত্যেকেরই কিছু দায়িত্ব পালন করা উচিত। আর আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাজ থেকে মাদক নির্মূল হতে পারে।

মাদকাসক্তি প্রতিকার ব্যবস্থাকে সামাজিক আন্দোলন হিসাবে উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আত্মকর্মসংস্থান ও মাদকবিরোধী বিভিন্ন র্যা লী/সমাবেশের আয়োজন করতে হবে। এ ছাড়া মাদক সমস্যার সমাধানকল্পে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারের জন্য বর্তমান সরকারকে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এই প্রসঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণের উপরও জোর দিতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসারের জন্য মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামগণ ও ধর্মীয় শিক্ষকগণ পারিবারিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ বিষয় ও বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এই লক্ষ্যে সাধারণ জনগণের জীবনের প্রতি আস্থা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করতে হবে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচীর পাশাপাশি বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরও পালন করতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কোন অবস্থাতেই জাতিকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া যায় না। তরুণ প্রজন্মকে মাদকদ্রব্যের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা এই মূহূর্তে অত্যন্ত জরুরী। আর এই জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমগুলোর অত্যন্ত স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

এ ছাড়া মাদকদ্রব্য চোরাচালানিদের বিরুদ্ধেও গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আজকের ও আগামী দিনের সুস্থ, সুন্দর, সুখকর জীবনের জন্যই মাদকদ্রব্যের ব্যবহার রোধ করতে হবে। সমগ্র বিশ্ববাসীকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার করার মধ্য দিয়ে মাদকের মরণ ছোবল থেকে বাঁচতে হবে। দেশ ও বিশ্ববিবেক সে প্রত্যাশাতেই প্রহর গুনছে।

লেখক: জাকির হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক এন্টি ড্রাগস সোসাইটি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X