বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ: ভাঙনের কিনারা থেকে আবার ব্যালটের পথে

শ্রীরাধা দত্ত
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

একটি অগণতান্ত্রিক ও দমনমূলক সরকারের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং তার পর টানা ১৮ মাস দুর্বল শাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার পর, বাংলাদেশ অবশেষে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে হবে একটি জাতীয় গণভোট। এই গণভোটে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেবেন নাগরিকরা। এই গণভোটের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সংবিধান সংস্কারের চাবিকাঠি, যা তরুণদের আন্দোলনের প্রধান দাবি।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দেশজুড়ে নানা ‘ফাটলরেখা’ স্পষ্ট হয়েছে; পরিচয়ের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ জোরালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। আশা করা যায়, একটি নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশে বহুল প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে।

তবে এই নির্বাচন হবে কঠিন ও তিক্ত লড়াইয়ের ময়দান। নির্বাচনপূর্ব সহিংসতায় তারই ইঙ্গিত মিলছে। ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য প্রায় ২ হাজার প্রার্থীর মধ্য থেকে ভোট দেবেন ১২ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি ভোটার। কিন্তু বাস্তবে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিতি বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটিয়েছে। ফলে নির্বাচনটি কার্যত রূপ নিয়েছে সাবেক দুই মিত্র- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর (জামায়াত) মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

বিএনপির নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত মাসের শেষ দিকে ঢাকায় ফিরে উষ্ণ অভ্যর্থনা পান। তিনি বাংলাদেশের জন্য নিজের ‘পরিকল্পনা’ তুলে ধরেছেন। জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দিল্লি ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেন।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস। বিএনপির নির্বাচনী স্লোগান, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, জনমনের আবহকে ভালোভাবেই ধরেছে। তবে টানা ১৭ বছরের বেশি সময় রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকার পর পুনরাগমন বিএনপির জন্য বহু চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। খালি হয়ে যাওয়া মধ্যপন্থী অবস্থানটি দৃঢ়ভাবে আয়ত্তে নিতে, ১০ দলীয় জোটের নেতৃত্বদানকারী বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর শক্ত প্রত্যাবর্তন করা ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামী মূলধারার নির্বাচনী রাজনীতিতে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জোরালোভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চায়। তাদের উপলব্ধি- ভোট বাড়ানোর এটি একমাত্র বড় সুযোগ। কারণ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে এমন সুযোগ নাও আসতে পারে। এ কারণেই তারা বিএনপির অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়ার বিরোধিতা করেছে।

কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পর, জামায়াত এখন জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের নির্বাচনী উপস্থিতি সুসংহত করার সম্ভাবনা দেখছে। আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও সংগঠিত এই দলটি ১১ দলীয় একটি পৃথক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যেখানে নতুন দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) রয়েছে। এতে তরুণদের দৃষ্টিতে কিছুটা আকর্ষণ বাড়লেও, তারা যে ৩২টি আসনে লড়ছে তার অনেকগুলোতে জয়ের সম্ভাবনা কম।

জামায়াতের স্লোগান- ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ তুলনামূলকভাবে দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তির ওপর জোর দেয়। তবে নারী প্রার্থী না থাকা এবং নারীদের বিষয়ে তাদের ও জোটসঙ্গীদের কিছু কঠোর অবস্থান স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। যদিও কিছু জামায়াত নেতা অফিসে ডে-কেয়ার সেন্টার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপনের পরিকল্পনার মাধ্যমে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন, তবু শহুরে মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতকে ঘিরে একটি ভাবমূর্তি সংকট রয়ে গেছে।

বাস্তবতা হলো, পার্লামেন্টের মোট আসনের অবস্থান প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শহরাঞ্চলে। গণমাধ্যম জরিপে জামায়াতের ভোটব্যাংক বাড়ার ইঙ্গিত মিললেও, তাদের এখনও ব্যাপক জনসমর্থন নেই। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটের সুবাদে, বিশেষ করে যেসব আসনে বিএনপি আগে জামায়াতকে ছাড় দিয়েছিল, সেখানে জামায়াত সুবিধা পাবে।

এসব গুরুত্বপূর্ণ আসনে তারা এখনো এগিয়ে। কৌশলগতভাবে, সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বাড়তি উদ্বেগকে কাজে লাগাতে জামায়াত হিন্দু প্রার্থীও দিয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘুরা আদৌ এই আহ্বানে সাড়া দেবে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের হাতে চাপ ও প্রভাব খাটানোর পথ এখনো খোলা রয়েছে।

গত কয়েক মাস বিএনপির জন্যও খুব গৌরবজনক ছিল না। স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও ঘুষের অভিযোগ সময়ে সময়ে সামনে এসেছে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন মুখদের অগ্রাধিকার দেয়া নিয়ে দলটির ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগতে পারে। কারণ বহিষ্কৃত বিএনপি প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ৭২টি আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন এবং অনেকেই যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে আছেন। একাধিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, বেশ কয়েকটি আসনে বিএনপি ও সাবেক বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এবার দলীয় প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রার্থীর ওপর ভিত্তি করেই ভোট পড়বে।

যুব ও প্রথমবারের ভোটার মিলিয়ে তারা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ। নতুন প্রজন্ম এবার পুরোপুরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশি তরুণরা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় হলেও, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং জবাবদিহি ও সুশাসনের আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে তাদের ভোটের পছন্দ এখনো অনিশ্চিত।

জাতীয় পার্টি বরাবরই সীমিত সংখ্যার মাধ্যমে বিজয়ী জোটকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। এবার ‘ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) নামে একটি নতুন জোট গঠিত হয়েছে, যেখানে জাতীয় পার্টির দুটি অংশ রয়েছে। তবে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন একটি অংশ এই জোটের বাইরে থাকায় নির্বাচনী অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য ডাকযোগে ব্যালট চালু করেছে। এবারে ভোট হবে কাগুজে ব্যালটে, ইভিএমে নয়।

সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণভাবে নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও রূপান্তরমূলক প্রভাব ফেলবে। ভারতের জন্য বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পছন্দ বেশ জটিল। শেষবার বিএনপি শাসনের সময় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার স্মৃতি ভারতের মনে রয়েছে। আর জামায়াতের প্রকাশ্য ভারতবিরোধী অবস্থানও পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বহু বাংলাদেশি রাজনীতিক ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবু ভারতের নীতিতে অসন্তুষ্ট কিছু শক্তির উপস্থিতি নির্বাচিত সরকারকে কৌশলে সামাল দিতে হবে।

আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসন এবং গত ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ভারতেবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। স্পষ্টতই, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এই ‘অন্তর্ভুক্তিহীন’ নির্বাচন নিয়ে ভারত সন্তুষ্ট নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দিল্লিকে খুশি করেনি। গত মাসে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটেছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিতি প্রশংসিত হয়। তিনি একমাত্র নেতা ছিলেন যিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এরপর ক্রিকেট সংক্রান্ত বিতর্ক সম্পর্ককে আরও খারাপ করে।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ- ভারতের আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া। এমনকি একটি অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অনলাইনে যুক্ত হন। সময়টি ছিল অত্যন্ত অনভিপ্রেত, যা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের একটি বড় অংশকে হতাশ করেছে।

আশা করা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচন শেষে দিল্লি ও ঢাকা তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর পথ খুঁজে নেবে। নিঃসন্দেহে, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

(লেখক হরিয়ানার ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক। তার এই লেখাটি অনলাইন ডেকান হেরাল্ড থেকে অনুবাদ)

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X