


জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা প্রাসঙ্গিত, কতটা উপযোগী;— এই কাদা মাটির মানুষগুলোর নরম তুলতুলে মন তিনি কতটা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন সেটি বুঝতে তার গানের এই একটি কলিই সম্ভবত যথেষ্ট—
‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব/তবু আমারে দেব না ভুলিতে।’
আজ জাতীয় কবির এই গানই যেন ধ্বনিত হচ্ছে-অনুরণিত হচ্ছে ষোলো কোটি মানুষের হৃদয়ে।৮০ বছর বয়সি একজন মহীয়সী নারীকে হারিয়ে যে এই বোধোদয় সে-আর বলতে!
তিনি তো আর সাধারণ কোনো নারী নন।ফুলের অনুরাগী গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে সবার হৃদয় জয় করা এক রাজনীতিক।রান্নাঘর থেকে আটপৌরে শাড়ি পরে সরাসরি রাজনীতির ময়দানে এসে সবচেয়ে অনভিজ্ঞ মানুষটি হয়ে গেলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান দূরদৃষ্টিসম্পন্ন।জীবনের বাঁকে বাঁকে আন্দোলন-সংগ্রামে-দ্রোহে-সংকটে-দুর্বিপাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে পথভ্রান্ত-দিকভ্রান্ত হতে দেননি। যখনই গভীর জাতীয় সংকটে পড়েছে দেশ—সরকারে থাকুন আর বিরোধী দলে, এগিয়ে এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিয়েছেন। কী কঠিন কথা সহজ করে বলেছেন— ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়।’ একই কণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে পার্লামেন্টে উচ্চারণ করেছেন-‘কারও ডিকটেশনে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভাগ্য নির্ধারিত হবে না।’ ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই।’ দেশকে কতটা ভালোবাসলে, দেশের মানুষের প্রতি কতটা কমিটমেন্ট থাকলে জেল-জুলুম সহ্য করে এবং প্রিয়জন হারানোর পরও মাটি কামড়ে দেশের পতাকা বুকে ধারণ করে পড়ে থাকা যায়।
সংযমী, সংগ্রামী, সহনশীল, সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল, সব রকম অন্যায়ে সর্বংসহা, অহিংস, আপসহীন, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক—এসব বিশেষণের কোনোটিই তৃতীয় বিশ্বের এই সফল স্টেটসম্যানের জন্য যথেষ্ট নয়।
সংযমী, সংগ্রামী, সহনশীল, সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল, সব রকম অন্যায়ে সর্বংসহা, অহিংস, আপসহীন, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক—এসব বিশেষণের কোনোটিই তৃতীয় বিশ্বের এই সফল স্টেটসম্যানের জন্য যথেষ্ট নয়। গোটা বিশ্বে তার সমসাময়িক বেশ কিছু ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা জুলুম-নির্যাতন সইতে সইতে আর না পেরে জীবন সায়াহ্নে এসে বলদর্পী রিজিমের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন।এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল খালেদা জিয়া। তার ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেছেন— এমন কোনো দৃষ্টান্ত দাঁড় করানো যাবে না। স্বামীর হত্যাকাণ্ড, পরবর্তীতে সন্তানের মৃত্যু চোখের সামনে দেখে, আরেক সন্তানের ওপর নির্মম নির্যাতন দেখেও ধৈর্যহারা হননি, অভীষ্ট লক্ষ্য তথা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। কতটা মানসিক দৃঢ়তা থাকলে কারাগারে বন্দি থাকতে থাকতে মৃত্যু উপক্রম হওয়ার পরও সংগ্রাম থেকে পিছু পা হননি। প্রাণ যায় যায় অবস্থায়ও সর্বংসহা হয়ে অবিচল থেকেছেন ন্যায়ের পথে।বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নামে বৃহৎ রাজনৈতিক দলটিকে অহিংস আন্দোলনের পথে পরিচালিত করেছেন।
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর গত বছরের আগস্টে ফ্যাসিবাদের পতন হয়।দেশবাসী হারানো গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। এই যে ফ্যাসিবাদ থেকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সেটি খালেদা জিয়ার দীর্ঘ আন্দোলন ও দৃঢ় নেতৃত্বের ফসল, কিন্তু সেই সময়ই কিছুটা ছন্দপতন! নিজ চোখে দেখে যেতে পারলেন না, বাংলাদেশের মানুষের কাঙিক্ষত গণতান্ত্রিক উত্তরণ। দুর্ভাগ্য এই জাতির! এই যুগসন্ধিক্ষণে যে মানুষটিকে ১৮ কোটি মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল তিনিই মৃত্যু নামের অমোঘ সত্যির কাছে ধরা দিলেন।
দুর্ভাগ্য এই জাতির! এই যুগসন্ধিক্ষণে যে মানুষটিকে ১৮ কোটি মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল তিনিই মৃত্যু নামের অমোঘ সত্যির কাছে ধরা দিলেন। ‘অমর্ত্য অনন্তলোকে স্রষ্টার সৃষ্ট প্রাণ তারই অস্তিত্বে বিলীন। আমাদের সবারই প্রত্যাবর্তন তারই কাছে।’
শত সহস্র হৃদয় কাঁদিয়ে খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর পাড়ি জমালেন স্বর্গালোকে। মহাকালের এই অনন্তযাত্রায় সঙ্গী তার শুধুই ভালোবাসা। লাখ লাখ মানুষ আজ তাকে অশ্রুসিক্ত নয়নে সশ্রদ্ধ বিদায় জানিয়েছে মানিক মিয়া এভিনিউতে।
অকৃত্রিম ভালোবাসায় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠা খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন দেশ ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা। অসীম অনন্তলোকে পাড়ি জমানোর সময় কিছুই নিয়ে যাননি খালেদা জিয়া। কোটি মানুষের ভালোবাসা সঙ্গী করে নিয়ে গেলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।জানাজায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।অনেকে হাউমাউ করে কেঁদেছেন।কেউবা নীরবে চোখের পানি মুছেছেন।১৮ কোটি মানুষকে শোক সাগরে ভাসিয়ে অনন্ত পথের যাত্রী হলেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়াকে এ দেশের মানুষ ভুলবে কেমন করে। এ জনপদের প্রতিটি বাঁকে তার হাতের ছোঁয়া রয়েছে। হৃদয়ের সমগ্র ভালোবাসা দিয়ে দেশের মানুষকে আগলে রেখেছেন। বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষুর দিকে চোখ রেখে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিশ্বস্ত পাহারাদার ছিলেন। আপস করলে জেলে যেতে হতো না। ক্ষমতা হাতছাড়া হতো না। এই মহাপ্রাণ তো ক্ষমতা চাননি, চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষের সমৃদ্ধি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে সারাটা জীবন হেঁটেছেন। দেশের মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে সাংসারিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুখ কী জিনিস তা চোখেও দেখেননি।সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন।
৫ আগস্টের পরও এই মহাপ্রাণ একটিবারের জন্য তার ওপর যারা শত অন্যায় করেছে, এত নির্যাতন করেছে, হত্যা করতে চেয়েছে তাদের একটিবারের জন্যও বিষোদগার করেননি। একটিবারের জন্য সমালোচনাও করেননি। পৃথিবীতে এমন রাজনীতিক পাওয়া সত্যি বিরল বৈকি!
খালেদা জিয়া বিএনপি চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, এশিয়ার দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী-এসব পরিচয় ছাপিয়ে গেছেন আরও আগেই। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
তাকে নিয়ে লিখতে গেলে মহাকাব্য হবে। দিস্তার পর দিস্তা কাগজ শেষ হবে কিন্তু তার কীর্তি ফুরোবে না। শেষ করব এই পঙক্তিটুকু দিয়ে—
‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি/করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঝের ঝরা ফুলগুলি।’
লেখক: আতাউর রহমান
সাংবাদিক ও লেখক।
মন্তব্য করুন