শুক্রবার
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিনিয়োগের কঠিন সময়ে বাংলাদেশের সংস্কারকে মডেল বলল জাতিসংঘ

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
  • ৩২ সংস্কারের ২৫টিই বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ
  • ২০২৫ সালে নিট এফডিআই বেড়েছে ৩৯.৩৬ শতাংশ
  • বিশ্বে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৬ শতাংশ

বৈশ্বিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে বাংলাদেশের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা -আঙ্কটাড। জেনেভায় সংস্থাটির বিনিয়োগ, উদ্যোগ ও উন্নয়ন কমিশনের ১৬তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কীভাবে বিনিয়োগ কৌশল পরিবর্তন করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের সংস্কার বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পায়।

আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পুনরুদ্ধার ছিল ভঙ্গুর এবং কয়েকটি দেশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বিনিয়োগ গ্রহণকারী দেশ মোট বৈশ্বিক বিনিয়োগের ৮০ শতাংশের বেশি পেয়েছে।

এ অবস্থায় বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি কোন খাতে বিনিয়োগ যাচ্ছে এবং তা অর্থনীতিতে কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো, অর্ধপরিবাহী, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তির মতো কৌশলগত খাতে ২০২৫ সালে ঘোষিত নতুন শিল্পভিত্তিক বিনিয়োগের ৪৪ শতাংশ গেছে। ২০২০ সালে এ হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। অথচ ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব খাতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো পেয়েছে মোট বিনিয়োগের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ।

অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রোচি। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে যে ৩২টি সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল, তার মধ্যে ২৫টি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। এসব সংস্কারের অগ্রগতি বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রকাশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের আস্থা বাড়িয়েছে।

নাহিয়ান রহমান রোচি বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে শুধু নীতিমালা গ্রহণ করলেই হবে না, বাস্তব বাধাগুলোও দূর করতে হবে। নিরাপত্তা ছাড়পত্র দ্রুত দেওয়া, বিদেশি অর্থায়নের প্রক্রিয়া সহজ করা, মূলধন দেশে ফেরত নেওয়ার নিয়ম স্পষ্ট করা, অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। চলতি বছর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং এর ফলাফল শিগগির প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ নিয়ে আঙ্কটাডের ২০২৬ সালের বাস্তবায়ন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনার পর থেকে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

তবে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন, বিনিয়োগসংক্রান্ত আইনকে সমন্বিত করা, সব বিনিয়োগসেবা পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক করা, অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র শক্তিশালী করার বিষয় রয়েছে।

বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থানেরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদনে গত বছর নতুন শিল্প বা ব্যবসা স্থাপনের মাধ্যমে বিনিয়োগ পাওয়া স্বল্পসংখ্যক স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সহজ ও সমন্বিত করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ সহায়তা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বসংক্রান্ত কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠানের আওতায় এসেছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনায় দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।

জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার মতে, এখন শুধু কত বিনিয়োগ একটি দেশ আকর্ষণ করছে, সেটিই বিবেচ্য নয়। সেই বিনিয়োগ উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বিনিয়োগের বাধা চিহ্নিত করার পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ই সংস্কারকে বাস্তব বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে রূপ দিতে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank