


পায়রা বন্দরকে আধুনিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর (আইসিটি) পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম স্থাপনের জন্য ১৭৫ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ব্যয় খাতগুলো নির্দিষ্ট আইটেমভিত্তিক না দেখিয়ে ‘থোক’ বরাদ্দ হিসেবে উপস্থাপন করায় সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
বিশেষ করে পরামর্শক নিয়োগ, আইসিটি সরঞ্জাম এবং কম্পিউটার-সফটওয়্যার কেনার মতো ব্যয়ের বিস্তারিত না থাকায় প্রকল্পটিকে বর্তমান অবস্থায় ছাড় দিতে রাজি হয়নি কমিশন। বরং প্রতিটি বড় ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) কার্যপত্রে দেখা গেছে, ‘আধুনিক সমুদ্র বন্দর হিসেবে পরিচালনার লক্ষ্যে পায়রা বন্দরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নির্ভর পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট সুবিধাদি সংযোজন’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন প্রস্তাব করা হয়েছে।
কার্যপত্র অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় তিনটি খাতেই রাখা হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে পরামর্শক সেবার জন্য ২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জামের জন্য ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের জন্য ২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এসব খাতের অধিকাংশ অর্থই ব্লক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে কোন সরঞ্জাম কতটি কেনা হবে, কোন সফটওয়্যার কী মূল্যে সংগ্রহ করা হবে কিংবা কোন যন্ত্রপাতির জন্য কত ব্যয় ধরা হয়েছে, তার কোনো সুস্পষ্ট বিবরণ প্রকল্প নথিতে নেই।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের বড় অঙ্কের অর্থ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রতিটি আইটেমের পৃথক ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা এবং মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি স্পষ্ট করতে হবে। এজন্য পিইসি সভায় বাসত্মবায়নকারী সংস্থার কাছে বিস্তারিত হিসাব উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে এনপিবিকে বলেন, থোক বরাদ্দ থাকলে প্রকল্পের পণ্যের স্পেসিফিকেশন থাকে না। তখন নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করা হয়। এতে প্রকল্পে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। এতে অনেক সময় দুর্নীতির পথ সহজ হয়। তাই বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে।
পরামর্শক সেবা নিয়েও কমিশনের আপত্তি রয়েছে। প্রকল্পে ১৮৮ জন-মাসের পরামর্শক সেবার জন্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রসত্মাব করা হয়েছে। এতে গড়ে প্রতি পরামর্শকের মাসিক সম্মানী প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাঁড়ায়। এত উচ্চ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী, কোন ধরনের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের কাজের পরিধি কী-এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবে কমিশন।
শুধু বড় ব্যয় নয়, প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অফিস ভবন থাকা সত্ত্বেও অফিস ভাড়া কেন প্রয়োজন, সেটি জানতে চাওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রচার ও বিজ্ঞাপন, বইপত্র ও সাময়িকী, সম্মানী, অনুষ্ঠান আয়োজন,
অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, মুদ্রণ ও বাঁধাই, স্ট্যাম্প ও মনিহারি সামগ্রীর মতো খাতেও বরাদ্দের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা হবে।
কার্যপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে অতিরিক্ত দায়িত্ব ও প্রেষণে নয়জন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ নেওয়া হয়নি। তাই জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ডিজিটাল ব্যবস্থাটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনাও ব্যাখ্যা করতে হবে।
আইসিটি সরঞ্জাম ও অফিস সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও কমিশন বিস্তারিত জানতে চায়। প্রকল্পে ফটোকপি মেশিন, উচ্চক্ষমতার ফটোকপি মেশিন, ট্যাব, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং অফিস টেবিল, চেয়ার, সোফাসেট, কনফারেন্স চেয়ার কেনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অথচ পায়রা বন্দরের নিজস্ব অফিস ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিদ্যমান। ফলে নতুন করে এসব কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এছাড়া প্রশিক্ষণ খাতে থোক বরাদ্দ রাখা হলেও কতজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী কত দিনের প্রশিক্ষণ পাবেন, কোথায় প্রশিক্ষণ হবে এবং কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এসব তথ্যও প্রকল্প নথিতে স্পষ্ট করা হয়নি। একইভাবে শ্রমিকের অনিয়মিত মজুরি, অনুষ্ঠান ব্যয় এবং বিভিন্ন সম্মানী খাতেরও বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের শর্ত অনুযায়ী প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ সরকারি ঋণ এবং বাকি ১০ শতাংশ পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে অর্থ বিভাগের দেওয়া শর্তগুলো প্রতিপালন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করার নির্দেশও দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও), সোলাস, আইএসও ও অন্যান্য বৈশ্বিক মানদ্ল অনুসারে একটি আধুনিক ডিজিটাল পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে জাহাজ চলাচল, কার্গো ব্যবস্থাপনা, বার্থিং, নেভিগেশন এবং বন্দর পরিচালনা আরও দক্ষ ও স্বয়ংক্রিয় হবে। বর্তমানে দেশের সমুদ্রপথে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ টন পণ্য পরিবহন হয় এবং প্রতি বছর এ পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। সেই বাড়তি চাপ সামাল দিতেই ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট-ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি নেই, কিন্তু শতকোটি টাকার ব্যয় ‘থোক’ বরাদ্দের আড়ালে রেখে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগও নেই। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে, কী কেনা হবে এবং কেন প্রয়োজন-এসবের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও আইটেমভিত্তিক হিসাব না দেওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি সহজে অনুমোদনের পথ পাচ্ছে না। বিস্তারিত ব্যয় বিভাজন যাচাই করেই প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করবে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে থোক বরাদ্দের ধোঁয়াশাই এখন পায়রা বন্দরের আইসিটি উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।