

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে চুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য সুপারিশসমূহ’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া ডব্লিউটিও নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য সদস্য দেশকেও একই সুবিধা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ এতে বেশ কিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে।
তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বেসরকারি খাতকে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হয়, তাহলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না—এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত, যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
তিনি জানান, বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে, কারণ বাংলাদেশের জ্বালানির বড় অংশ ওই অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে সরে আসা উচিত। কারণ চলতি অর্থবছরেও উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর–জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চলতি অর্থবছরে এই অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে রয়েছে। ফলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন
