শনিবার
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘সমঝোতার’ চাঁদা ও নতুন সংজ্ঞার রাজনীতি 

মাসুম পারভেজ
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩ এএম
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
expand
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংজ্ঞা দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। কখনও গণতন্ত্র, কখনও উন্নয়ন, কখনও নির্বাচন শব্দগুলো সময় ও ক্ষমতার প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ পেয়েছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ‘চাঁদা’।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ যে অর্থ নেওয়া হয়, সেটিকে তিনি চাঁদা বলতে চান না। তার যুক্তি যদি জোরপূর্বক আদায় না হয়, তবে সেটি চাঁদাবাজি নয়। বরং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়ার ফল।

এই বক্তব্য জনপরিসরে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সড়ক পরিবহন খাতে সংগঠনের নামে আদায় করা অর্থ দীর্ঘদিন ধরেই ‘চাঁদা’ হিসেবেই পরিচিত।

মন্ত্রী বলেছেন, মালিক ও শ্রমিক সমিতি নিজেদের কল্যাণের জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ তোলে এটি অলিখিত নিয়মের মতো চালু আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ‘সমঝোতা’ কতটা স্বতঃস্ফূর্ত?

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও অস্বীকার করার উপায় নেই। যদি কোনো মালিক বা চালক সংগঠনের নিয়ম না মানেন, তার গাড়ি রাস্তায় নামতে বা স্ট্যান্ড ব্যবহার করতে সমস্যায় পড়তে হয় এমন অভিযোগও বহু পুরোনো।

নবগঠিত বিএনপি সরকার যখন প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে, তখন রবিউল আলমের এই বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে। জনগণ আশা করেছিল পরিবহন খাতে অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া, টার্মিনালভিত্তিক অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা আসবে। তার বদলে যখন শব্দের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তখন হতাশা বাড়ে।

মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, যখন যার প্রভাব থাকে, তখন তার দলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য দেখা যায়। এই স্বীকারোক্তি সমস্যার গভীরতাই তুলে ধরে। যদি সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক প্রভাবনির্ভর হয়, তবে সেটি কতটা নিরপেক্ষ ও সমঝোতাভিত্তিক সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

পরিবহন মালিকরা বলছেন, সংগঠনের তহবিল শ্রমিক কল্যাণ, দুর্ঘটনা সহায়তা বা সামাজিক কাজে ব্যয় হয়। কিন্তু এই অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? এর হিসাব কি জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়?

বাস্তবতা হলো, পরিবহন খাতে যে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত যাত্রীর পকেট থেকেই যায়। ভাড়া বাড়ে, পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ে প্রভাব পড়ে বাজারে। অতএব ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ আদায় করা অর্থও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।

রাজনীতিতে শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম। ‘চাঁদাবাজি’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে নেতিবাচক অর্থ বহন করে। তাই কেউ যখন বলেন এটি চাঁদা নয়,কিংবা সমঝোতার অর্থ তখন সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যাখ্যা নয়; বরং একটি রাজনৈতিক অবস্থান।

কিন্তু জনগণের কাছে চাঁদাবাজি মানে শুধু শারীরিক জোর নয়; প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত চাপও তার অংশ। যদি কেউ জানেন অর্থ না দিলে তার ব্যবসা বা পেশাগত কার্যক্রম ব্যাহত হবে, তবে সেটিকে পুরোপুরি স্বেচ্ছা বলা কঠিন।

পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই মালিক-শ্রমিক সংগঠন, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অঘোষিত সমন্বয়ের অভিযোগে আলোচিত। যানবাহনের ফিটনেস, রুট পারমিট, স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ সব মিলিয়ে একটি জটিল কাঠামো তৈরি হয়েছে।

সরকার যদি মনে করে সংগঠনের অর্থ সংগ্রহ বৈধ, তবে সেটিকে আইনগত কাঠামোর মধ্যে এনে নিরীক্ষা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কত টাকা তোলা হচ্ছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করতে হবে। এতে বিতর্ক কমবে।

নবগঠিত সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনআস্থা অর্জন ও ধরে রাখা। তাই সংজ্ঞার বিতর্কে না গিয়ে সড়ক পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা ও সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করাই হবে রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ পদক্ষেপ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X