

সব আশঙ্কা, অনিশ্চয়তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ইতিহাসের নজীর বিহীন উৎসাহ উদ্দীপনায় শান্তিপূর্ণ ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদকেও যেন হার মানিয়েছে এবারের নির্বাচনী উৎসব।
সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর পর ভোট গণনা চলছে। দেশের কোথাও প্রাণঘাতী সংঘাত হয়নি। দীর্ঘ দেড় যুগ ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ মেটানোর দিনে কোটি কোটি তরুণ-যুবক আর দেশের নাগরিকেরা রক্ত না ঝরিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের নতুন বার্তা দিয়ে ভোটকেন্দ্রে রায় প্রদানের এক অনন্য নজির তৈরি করলেন। এমন শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ বাংলাদেশ আর কখন দেখেনি, স্মরণকালে গণতান্ত্রিক বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত অধিকাংশ দেশেও এমন উদাহরণ নেই।
কিছু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা গণভোটের ভোটগ্রহণ হয়েছে সারা দেশে। এর আগের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই সাধারণ ঘটনা হলেও এবার এ ধরনের অভিযোগ ওঠেনি। কোথাও ভোট গ্রহণ স্থগিতের খবরও পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে ইতিহাসে এ এক অনন্য নজির। নির্বাচনের এই দিনে সারা দেশে কোথাও কোথাও ভোটারের উপস্থিতি কম দেখা গেলেও যেমন বড় ধরনের রক্তাক্ত সহিংসতা হয়নি, তেমনি নেই প্রাণহানি, হানাহানির খবর। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ও নির্বাচন কমিশনের তদারকিতে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নির্বিঘে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
ভোটের মাঠ থেকে বিশ্ববাদী বাংলাদেশ থেকে একটি বার্তা পেয়ে গেল ৪ কোটি তরুণ ভোটারই শুধু নন, সব বয়সি ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পেলে তাদের রায় দিতে শক্তির প্রয়োজন হয় না; যা গণতান্ত্রিক যাত্রায় বাংলাদেশকে নতুন পথের দিশা দিল। এরই মধ্যে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করা শুরু হয়ে গেছে। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। চলে বিকেল সাড়ে ৪টায়। এখন ভোট গণনা চলছে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে স্থগিত হওয়া নির্বাচনের তফসিল পরে ঘোষণা করা হবে।
এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত শতাধিক আসনের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি চারপঞ্চমাংশ আসনে ও একপঞ্চমাংশ আসনে জামায়াত জোট বিজয়ী হয়েছেন।
ঝিনাইদহ-১ আসনে বিএনপির মো. আসাদুজ্জামান, সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির নাছের চৌধুরী, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জামায়াতের মোস্তাফিজুর রহমান, ঠাকুরগাঁও-১ বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কুষ্টিয়া-১ বিএনপির রেজা আহমেদ, পটুয়াখালি-১ বিএনপির আলতাফ হোসেন চৌধুরী, রংপুর-৩ আসনে জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল, কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ, লক্ষিপুর-৩ বিএনপির শহিদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, নেত্রকোনা-১ আসনের ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল, বগুড়া-৫ বিএনপির জিএম সিরাজ,চট্টগ্রাম-৯ আবু সুফিয়ান, পটুয়াখালি-৩ গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর, কুমিল্লা-১১ জামায়াতের সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ঢাকা-২ বিএনপির আমান উল্লাহ আমান, কুমিল্লা-৩ বিএনপির কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, সাতক্ষিরা-২ জামায়াতের আবদুল খালেক, কিশোরগঞ্জ-৪ অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, পটুয়াখালি-৪ বিএনপির এ বিএম মোশারেফ হোসেন, বরগুনা-২ বিএনপির নুরুল হক মনি, সিলেট-৫ খেলাফত আন্দোলনের মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান, সাতক্ষিরা-৪ জামাতের গাজী নজরুল ইসলাম, রংপুর-৫ জামায়াতের গোলাম রব্বানী, মেহেরপুর-১ জামায়াতের তাজউদ্দিন খান, মেহেরপুর-২ জামায়াতের নাজমুল হুদা, যশোর-৩ বিএনপির অনিন্দ ইসলাম অনিক, রাজবাড়ি-১ বিএনপির আলী নেওয়াজ মোহাম্মদ খৈয়াম, ভোলা-৩ বিএনপির হাফিজ উদ্দিন, যশোর-৫ জামায়াত গাজী এনামুল হক, বরিশাল-৪ বিএনপির রাজিব আহসান, টাঙ্গাইল-১ ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, জামালপুর-৪ বিএনপির ফরিদুল কবির তালুকদার শামিম, মানিকগঞ্জ-২ বিএনপির মইনুল ইসলাম খান, মানিকগঞ্জ-৩ বিএনপির আফরোজা খান রিতা, ঢাকা-১ বিএনপির খন্দকার আবু আশফাক, লালমনিরহাট-৩ বিএনপি আসাদুল হাবিব দুলু, যশোর-৬ জামায়াতের মোক্তার আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ জামায়াতের নুরুল ইসলাম, কুমিল্লা-১ বিএনপি খন্দকার মোশাররফ হোসেন, চট্টগ্রাম-৫ বিএনপির মীর হেলাল, চট্টগ্রাম-৭ বিএনপির হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৩ বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-১০ সাঈদ আল নোমান, কক্সবাজার-১ বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদ, ফেনি-২ জয়নাল আবেদিন, হবিগঞ্জ-১ বিএনপির ড. রেজা কিবরিয়া, হবিগঞ্জ-২ বিএনপি সাখাওয়াত হোসেন জীবন, হবিগঞ্জ-৩ বিএনপির জিকে গাউস, হবিগঞ্জ-৪ বিএনপির এস এম ফয়সাল, সুনামগঞ্জ-১ বিএনপির কামরুজ্জামান, সুনামগঞ্জ-৩ বিএনপি কয়ছর আহমদ, সুনামগঞ্জ-৪ বিএনপির নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জ-৫ বিএনপির কলিমউদ্দিন মিলন, গোপালগঞ্জ-২ বিএনপির কে এম বাবর আলী, ভোলা-১ জেপি আন্দালিব রহমান পার্থ, বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তবে রংপুর বিভাগ ছাড়া রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামের শতকরা ৯০ শতাংশ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। সারাদেশের বেশির ভাগ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট শান্তিপূর্ণ, সুশৃংখল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায় সমগ্র জাতিকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে রয়েছে।
নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ভোটের ফলাফল সঠিকভাবে ঘোষণা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃংখলা বাহিনীসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে, নির্বাচিত সরকারকে তা সম্মান করতে হবে। জনগণের সমর্থনে বিএনপির বিজয় অনিবার্য।
বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় পাবে। একইসঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় যেন কোনও অসংগতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে মাঠে সক্রিয় থাকতে।
অন্যদিকে নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলন করেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির মুখপত্র ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এহসানুল মাহমুদ জুবায়ের বলেছেন, আমরা আশা করছি, বিপুল ভোটে সর্বোচ্চসংখ্যক আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করব, ইনশা আল্লাহ।
সরকার ও নির্বাচন কমিশন ভালো নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি করেছিল। তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রেখেছে। সবাই যার যার অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছেন, এই চেষ্টার ফলেই বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়েছে।
মন্তব্য করুন