

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নারীদের মুখমণ্ডলে অবাঞ্ছিত লোম বা চুল গজানো একটি প্রচলিত সমস্যা হলেও এটি মানসিক অস্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক নারী এই সমস্যার কারণে সামাজিক পরিবেশে সংকোচ বোধ করেন। তবে লজ্জা কিংবা ভুল ধারণার কারণে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখে অবাঞ্ছিত লোম কখনও শরীরের স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনের অংশ হতে পারে, আবার কখনও এটি কোনো জটিল হরমোনজনিত বা অন্তর্নিহিত রোগের পূর্বসংকেতও হতে পারে। তাই বিষয়টি অবহেলা না করে সঠিক কারণ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি।
কেন নারীদের মুখে অবাঞ্ছিত লোম গজায়
নারীর মুখমণ্ডলে অবাঞ্ছিত লোম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো এন্ড্রোজেন নামক পুরুষ হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি বা এই হরমোনের প্রতি ত্বকের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা। যদিও নারীদেহে স্বাভাবিকভাবেই সামান্য পরিমাণ এন্ড্রোজেন থাকে, তবে এর ভারসাম্য নষ্ট হলে মুখের সূক্ষ্ম ভেলাস হেয়ার ধীরে ধীরে মোটা, গাঢ় ও কালো টার্মিনাল হেয়ারে রূপ নেয়।
এ সমস্যার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হিসেবে ধরা হয় পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)। এ ক্ষেত্রে মুখে লোম বৃদ্ধির পাশাপাশি অনিয়মিত মাসিক, ওজন বেড়ে যাওয়া, ব্রণ, ত্বকে কালচে দাগ এবং বন্ধ্যাত্বের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া পারিবারিক বা বংশগত প্রবণতা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বয়ঃসন্ধিকাল, গর্ভাবস্থা ও মেনোপজের সময় হরমোনের হঠাৎ ওঠানামার কারণেও মুখে অবাঞ্ছিত লোম দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রক্তে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও ত্বকের হেয়ার ফলিকল এন্ড্রোজেনের প্রতি অতিসংবেদনশীল হয়ে ওঠে, যা বংশগতভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে পারে।
এছাড়াও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি, থাইরয়েড কিংবা পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যাও মুখে অতিরিক্ত লোম গজানোর জন্য দায়ী হতে পারে।
চিকিৎসা ও প্রতিকার: কী কী উপায় রয়েছে
মুখের অবাঞ্ছিত লোম দূর করতে চিকিৎসা পদ্ধতিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায় অস্থায়ী ও স্থায়ী।
অস্থায়ী পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে শেভিং, ব্লিচিং, ওয়াক্সিং, ডিপিলেটরি ক্রিম ব্যবহার, থ্রেডিং ও বিভিন্ন ধরনের প্যাক। এসব পদ্ধতিতে সাময়িকভাবে লোম দূর করা গেলেও কিছুদিন পর আবার লোম গজায়।
স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির মধ্যে ইলেক্ট্রোলাইসিস একটি কার্যকর উপায়। এতে প্রতিটি চুলের ফলিকলে সূক্ষ্ম সুঁই প্রবেশ করিয়ে বৈদ্যুতিক প্রবাহ দেওয়া হয়, যার ফলে ফলিকল স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। যদিও এটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, তবে সঠিকভাবে করলে ফল দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আরেকটি আধুনিক ও জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো লেজার হেয়ার রিমুভাল। এতে লেজার রশ্মি চুলের মেলানিন রঞ্জক পদার্থে শোষিত হয়ে চুলের গোড়া দুর্বল বা নষ্ট করে দেয়। সাধারণত ৬ থেকে ৮টি সেশন নেওয়ার পর লোমের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, যা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচিত।
হরমোনজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এন্ড্রোজেনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এন্টি-এন্ড্রোজেন জাতীয় ওষুধ, যেমন স্পাইরোনোল্যাকটোন, মুখের অবাঞ্ছিত লোম কমাতে কার্যকর হতে পারে। পিসিওএস আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে মেটফরমিন বিশেষভাবে উপকারী বলে চিকিৎসকরা মনে করেন।
এ ছাড়া ইফ্লরনিথিনযুক্ত ক্রিম লোমের বৃদ্ধি ধীর করতে সহায়তা করে, যদিও এটি স্থায়ী সমাধান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম, অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো মুখে অবাঞ্ছিত লোমের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সবশেষে বলা যায়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে নারীদের মুখের অবাঞ্ছিত লোম একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা। সঠিক কারণ নির্ণয় ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে আত্মবিশ্বাস ও স্বাচ্ছন্দ্য দুটোই ফিরে পাওয়া সম্ভব।
মন্তব্য করুন

