

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বডিবিল্ডিং বা পেশিবহুল শারীরিক গঠনকে আমরা সাধারণত সুস্থতা ও উচ্চ ফিটনেসের প্রতীক হিসেবে দেখি। তবে বাহ্যিক এই সুঠাম অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার বাস্তবতা ইদানীং বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ব্রাজিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র- সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন উদীয়মান ও সুপরিচিত বডিবিল্ডারের আকস্মিক মৃত্যু এই প্রশ্ন সামনে এনেছে যে, বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হওয়া সত্ত্বেও এই ক্রীড়াবিদরা কেন এত অল্প বয়সে প্রাণ হারাচ্ছেন?
অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ও হৃদযন্ত্রের রূপান্তর
অকালমৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিকারী বিভিন্ন ওষুধের (PEDs) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। দ্রুত পেশি বৃদ্ধি ও শরীর ছিপছিপে করার আশায় অনেকেই এই কৃত্রিম উপাদানের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েন।
তবে স্টেরয়েড কেবল বাইসেপ বা বাহুর পেশিই বড় করে না, বরং হৃদযন্ত্রকেও অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত করে। অতিরিক্ত ভারোত্তোলন ও স্টেরয়েডের যৌথ প্রভাবে হৃদপেশি, বিশেষ করে বাম নিলয়ের দেয়াল মারাত্মকভাবে পুরু হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘লেফট ভেন্ট্রিকুলার হাইপারট্রফি’ বলা হয়।
কার্ডিওভাসকুলার রোগের আশঙ্কা ও অকালমৃত্যু
গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাদার বডিবিল্ডারদের আকস্মিক হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি অপেশাদার প্রতিযোগীদের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি। স্টেরয়েড ব্যবহারের ফলে ধমনিতে প্লাক জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হয় এবং কার্ডিওমায়োপ্যাথির ঝুঁকি প্রায় নয় গুণ বৃদ্ধি পায়।
অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়া হৃদপিণ্ড একপর্যায়ে রক্ত পাম্প করার স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (অ্যারিথমিয়া), মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক এবং আকস্মিক হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
শারীরিক চাপ ও মানসিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
শুধু স্টেরয়েড নয়, প্রতিযোগিতার ঠিক আগে দ্রুত ওজন কমানোর চরম প্রচেষ্টা, শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার প্রবণতা এবং তীব্র শক্তি-নির্ভর প্রশিক্ষণ হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মারাত্মক মানসিক প্রতিক্রিয়া। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে স্টেরয়েড 'সাইকেল' পরিচালনা করলেও অনিদ্রা, মেজাজ পরিবর্তন, মারাত্মক নাইট সোয়েট (রাতের ঘাম) এবং এক ধরণের মানসিক আসক্তি তৈরি হয়, যা ক্রীড়াবিদদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
তথ্য গোপনীয়তা ও চূড়ান্ত সচেতনার প্রয়োজন
কৃত্রিম উপাদানগুলো শরীরের প্রাকৃতিক হরমোনের মতো হওয়ায় মৃত্যুর পর সাধারণ ময়নাতদন্তে অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের উপস্থিতি প্রায়ই ধরা পড়ে না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, চিকিৎসকের সাহায্যে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারের কোনো নিরাপদ উপায় নেই।
বাহ্যিক পেশিবহুল গঠন কখনোই ভেতরের সুস্থতার নিশ্চয়তা দেয় না, বরং ভুল পথের অনুকরণে অকালেই ঝরে যাচ্ছে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন।


