

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে প্রতিদিনই দেখা যায় ছোট্ট নুর মোহাম্মদকে। বয়স আনুমানিক ৫ বছর। ছোট্ট এক হাতে ফুল আর চকলেট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে। কারও কাছে ফুল বিক্রি করে, কারও হাতে তুলে দেয় চকলেট। কেউ কিনে নেয়, কেউ নেয় না। তবু নুরের ঘোরাঘুরি থামে না।
জন্মগতভাবেই নুরের একটি হাত নেই। যে বয়সে তার বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সে জীবিকার তাগিদে তাকে ছুটতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।
সকাল হলে মায়ের সঙ্গে ঘর থেকে বের হয় নুর। দিনভর ক্যাম্পাসের পথে পথে ফুল আর চকলেট বিক্রি করে। সন্ধ্যা হলে ফিরে যায় ইসলামবাগের একটি ঘিঞ্জি বস্তির ছোট্ট ঘরে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে তার দিন।
প্রতিদিন নুরের আয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। দিনের শেষে সেই টাকা তুলে দেয় মায়ের হাতে। নুরের সামান্য আয় আর মায়ের ফুল বিক্রির উপার্জনেই চলে মা-ছেলের সংসার।
নুরের কথাগুলোও খুব একটা স্পষ্ট নয়। কথা বলতে গেলে অনেক শব্দ জড়িয়ে যায়। কিন্তু তার চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি দেখা যায় সরলতা। কেউ ফুল বা চকলেট না কিনলেও নুরের নিষ্পাপ হাসি দেখে কেউ কেউ হাতে কিছু টাকা তুলে দেন।
নুরের সবচেয়ে পছন্দের চকলেট কফি চকলেট। কিন্তু চকলেটের চেয়েও তার পছন্দ যেন আরও দূরের কিছু—আকাশ।আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নুর বলে, একদিন সে পাইলট হবে।
পাইলট কেন হতে চায়, সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য ঠিকমতো দিতে পারে না সে। পাইলট হতে কী পড়াশোনা করতে হয়, কতটা পথ পাড়ি দিতে হয়—এসবও তার জানা নেই। শুধু জানে, একদিন সে বিমান চালাবে। আকাশে উড়বে।
হয়তো এটাই শিশুমনের স্বপ্ন—যেখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কিন্তু নুরের সেই স্বপ্নের সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা অভাব।
কয়েকদিন স্কুলে গিয়েছিল নুর। স্কুলের পরিবেশ ভালো লাগত তার। কিন্তু এখন আর যাওয়া হয় না। স্কুলে গেলে ফুল-চকলেট বিক্রি করা হবে না। আর ফুল-চকলেট বিক্রি না করলে সংসারে তার সামান্য আয়টুকুও থাকবে না।
নুরের নিজের ভাষায়, ‘ইনকাম না করলে খেতে পারবো না।’
এই একটি বাক্যেই যেন তার ছোট্ট জীবনের বড় বাস্তবতাটা ধরা পড়ে। নুরের জীবনে বাবার ভালোবাসার স্মৃতিও নেই। জন্মের পর বাবার মুখ দেখেনি সে। মায়ের সঙ্গেই ইসলামবাগের একটি বস্তিতে তার বেড়ে ওঠা। প্রতিদিন সকালে মা-ছেলের একসঙ্গে বের হওয়া, সারাদিন কাজ করা আর রাতে ঘরে ফেরা—এভাবেই চলছে তাদের জীবন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নুরকে ফুল ও চকলেট বিক্রি করতে দেখা যায়। তার মায়াবী চেহারা, নিষ্পাপ হাসি ও সুন্দর ব্যবহারে অনেকেই মুগ্ধ হন। কেউ ফুল বা চকলেট না নিলেও ভালোবেসে কেউ কেউ তাকে টাকা দিয়ে যান।
ছোট্ট এক হাতে ফুল, কয়েকটি চকলেট। একেকজনের কাছে যায়, আবার ফিরে আসে। তার চোখে হয়তো ক্ষুধা আছে, ক্লান্তি আছে; কিন্তু সেই চোখেই কোথাও যেন আকাশও আছে।
যে শিশু প্রতিদিন কয়েকটি ফুল আর চকলেট বিক্রি করে মায়ের হাতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা তুলে দেয়, সেই শিশুই আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে—একদিন সে বিমান চালাবে।
হয়তো নুর এখনো জানে না পাইলট হওয়ার পথ কতটা দীর্ঘ। জানে না সেই পথ পাড়ি দিতে কত পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ আর প্রস্তুতি প্রয়োজন। সে শুধু জানে, আকাশে উড়তে চায়। তার স্বপ্নটা তাই হয়তো খুব ছোট্ট, খুব সরল। কিন্তু স্বপ্ন তো এমনই—শুরুতে তার কোনো হিসাব থাকে না।
নুরের একটি হাত নেই। নেই নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ। নেই বই-খাতার নিশ্চয়তা। নেই শৈশবের স্বাভাবিক নিশ্চিন্ত দিনগুলোও। তবু তার চোখে আকাশ আছে। আর সেই আকাশে একটি ছোট্ট বিমান উড়ে বেড়ায়—যার ককপিটে বসে আছে নুর মোহাম্মদ। স্বপ্ন দেখতে তো কোনো হাতের প্রয়োজন হয় না।
লেখক: রুহুল আমীন শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

