সোমবার
১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪২ এএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অগ্রযাত্রায় যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যে উজ্জ্বল, তারমধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এক অনন্য নাম।

আজ ১২ জানুয়ারি- এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের ৫৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ এই পথচলায় জাবি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি হয়ে উঠেছে মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি ও প্রগতির এক শক্তিশালী কেন্দ্র।

১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট 'জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়' নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়, যা ছিল ঢাকার চাপ কমাতে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য।

পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে 'জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়' রাখা হয়। রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী শিক্ষা পরিবেশ ও স্বতন্ত্র একাডেমিক কাঠামোর জন্য পরিচিতি লাভ করে।

প্রতিষ্ঠালগ্নে ৪টি বিভাগ ও ১৫০জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও সময়ের পরিক্রমায় জাবি আজ পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে এখানে রয়েছে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও চারটি পৃথক ইনস্টিটিউট, যেখানে প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী জ্ঞানার্জনে যুক্ত হচ্ছে।

এছাড়া বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্যে জাবিতে রয়েছে ছাত্রদের ১১টি এবং ছাত্রীদের ১০টিসহ মোট ২১টি আবাসিক হল। হলগুলোতে রয়েছে সার্বক্ষণিক গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, একক বেড, ফ্যান ও চেয়ার-টেবিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দেশের শিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাইমস হায়ার এডুকেশন ও কিউএস ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে জাবি দেশে শীর্ষস্থান দখল করেছে, যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় নিরলস পরিশ্রম ও দেশের প্রতি অনন্ত ভালোবাসা ও উৎসর্গের ফসল। জাবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয় বরং এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের প্রতিনিধিত্ব করে সুনাম বয়ে আনছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। লাল শাপলার বিল, অসংখ্য লেক, পশুপাখির বিচরণক্ষেত্র, ঘন বনজঙ্গল এবং শীত মৌসুমে আগত অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত ক্যাম্পাস সব মিলিয়ে জাবি যেন প্রকৃতি ও জ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একাডেমিক উৎকর্ষতার পাশাপাশি জাবি বরাবরই দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ সাম্প্রতিক সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জাবির শিক্ষার্থীরা রেখেছে সাহসী ও গৌরবোজ্জ্বল পদচিহ্ন।

সুদীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় নতুন শিক্ষার্থী নেতৃত্ব পেয়েছে ছাত্র-ছাত্রীরা। এতে যেমন শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া প্রশাসনের নিকট সহজেই পেশ করে আদায় করা যাচ্ছে, তেমনি ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

সংস্কৃতিচর্চায়ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান। নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, চারুকলা ও চলচ্চিত্রচর্চায় জাবির শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে পরিচিত। এখানকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয় পর্যায়ে বহু গুণী শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী উপহার দিয়েছে।

৫৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের অংশগ্রহণে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, স্মৃতিচারণ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে চলার অঙ্গীকার করছে জ্ঞান, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে। সবুজে ঘেরা এই বিদ্যাপীঠের ৫৬ বছরের পথচলা কেবল অতীতের গৌরব নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার এক দৃঢ় ভিত্তি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X