সোমবার
৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেকর্ড ২৬ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

• প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে সরকারকে

• মুনাফার প্রায় পুরোটাই যাচ্ছে সরকারের হাতে, বাড়ছে প্রভিশন

• কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা পাচ্ছেন ৬টি বোনাস

• পরিচালনা পর্ষদে আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন

সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় সব টাকাই সরকারকে তুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের কোষাগারে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে সংস্থাটি। বিদায়ী অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ২৬ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর প্রায় পুরোটাই সরকারকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করে পরিচালনা পর্ষদ। সূত্র মতে, বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিট মুনাফা করেছে ২৬ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে মধ্যবর্তী সময়ে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর আরও ১৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ হতে সরকারের হাতে যাচ্ছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

নতুন হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস প্রফিট হয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট এক্সপেন্ডিচার বা ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। সব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা।

সূত্র অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছিল ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। পরের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মুনাফা আরও বেড়ে হয় প্রায় ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর এবার তা ছাড়িয়ে গেছে ২৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা প্রায় আড়াই গুণ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিমাণ নিট মুনাফা করেছে, তার প্রায় পুরোটাই এখন সরকারের কোষাগারে চলে যাচ্ছে। নিট মুনাফার ৯৯ শতাংশেরও বেশি অর্থ সরকারকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই বিপুল পরিমাণ লাভের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য ৬টি বোনাস ঘোষণা করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে চাপের সময়ে সরকারের জন্য এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সরকারের বাজেটের ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয়ই প্রধান উৎস। সেই রাজস্ব ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে একসঙ্গে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা যোগ হওয়া সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সহায়তা দিতে পারে।

তবে এবার শুধু মুনাফার অঙ্কই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের আরেকটি দিক উল্লেখযোগ্য। সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ লোকসান মোকাবিলায় এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রভিশন রাখা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কারণ কোনো সম্পদ, বিনিয়োগ বা অন্যান্য আর্থিক অবস্থান থেকে ভবিষ্যতে লোকসানের সম্ভাবনা থাকলে তার বিপরীতে আগেই অর্থ সংরক্ষণ করা হলে হঠাৎ করে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয় না। ফলে প্রভিশন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আর্থিক হিসাবের ক্ষেত্রে সতর্কতার লক্ষণ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুনাফার প্রায় পুরোটাই সরকারকে দিচ্ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিপরীতে প্রভিশনও রাখছে। অর্থাৎ মুনাফা সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতের ঝুঁকিও হিসাবের মধ্যে রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ আসছে বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে, আর সেখান থেকে ব্যয় মেটানোর পর যে উদ্বৃত্ত থাকছে সেটিই শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্বে যুক্ত হচ্ছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে সরকারের রাজস্ব পাওয়া দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব মুনাফা করা নয়; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রানীতি পরিচালনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ। তাই সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি মোকাবিলার সামর্থ্য অক্ষুণ্ন রাখাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা নেট মুনাফা সরকারের জন্য বড় একটি আর্থিক সহায়তা হয়ে উঠেছে। এর প্রায় পুরোটাই—২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা—সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে। আর সম্ভাব্য ঝুঁকির বিপরীতে প্রভিশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবার মুনাফার পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন