মঙ্গলবার
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, সংকটে নীলফামারীর কৃষকরা

নীলফামারী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
নীলফামারী
expand
নীলফামারী

নীলফামারীতে বর্ষার বৃষ্টি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই ফসলি জমি দিনের পর দিন পানিতে ডুবে থাকছে। ফলে চলতি আমন মৌসুমে ধীরগতিতে চলছে চারা রোপণ। কৃষকরা বলছেন, শুধু অতিবৃষ্টি নয়—প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল, কালভার্ট বন্ধ করে বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় শিল্পকারখানা নির্মাণের কারণেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

কৃষি বিভাগ বলছে, এখনও আমনের চারা রোপণের পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। তবে কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে নীলফামারীর ছয় উপজেলায় ১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন চাল।

এর মধ্যে নীলফামারী সদর উপজেলায় ২৭ হাজার ৯৭৯ হেক্টর, সৈয়দপুরে ৮ হাজার ১২০, ডোমারে ১৭ হাজার ৯২৫, ডিমলায় ২১ হাজার ২৪১, জলঢাকায় ২২ হাজার ৯৮৫ এবং কিশোরগঞ্জে ১৪ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হওয়ার কথা।

গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আমনের আবাদ হয়েছিল। ১ লাখ ১৩ হাজার ১৭২ হেক্টরের বিপরীতে আবাদ হয় ১ লাখ ১৩ হাজার ২০৮ হেক্টরে। উৎপাদিত হয় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯২৬ মেট্রিক টন চাল, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন বেশি।

কিন্তু চলতি মৌসুমে টানা বৃষ্টির কারণে সেই গতি দেখা যাচ্ছে না। রবিবার (১৯ জুলাই) পর্যন্ত জেলার মোট ২৬ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে আমনের চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোপণ হয়েছে নীলফামারী সদর উপজেলায় ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে।

সদরের গোড়গ্রাম হাজিপাড়া গ্রামের কৃষক লিয়াকত আলী বলেন, "উঁচু জমিতে কোনোভাবে চারা লাগানো যাচ্ছে। কিন্তু নিচু জমিতে এখনও হাঁটুসমান পানি। পানি না নামলে জমি প্রস্তুত করা সম্ভব নয়।"

কিশোরগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, "বীজতলার চারা প্রস্তুত। কিন্তু জমিতে পানি থাকায় রোপণ শুরু করতে পারছি না। কয়েকদিন রোদ পেলেই কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে।"

ডিমলার বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক রহিম উদ্দিন জানান, শ্রমিক থাকলেও অতিরিক্ত কাদা ও পানির কারণে তারা মাঠে কাজ করতে পারছেন না। এতে সময়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

একই গ্রামের কৃষক শাহজাহান আলীর ভাষায়, "আমনই আমাদের প্রধান ফসল। পানি নেমে গেলেই দিন-রাত কাজ করে রোপণ শেষ করবো। তবে এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে কিছু জমি নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে।" স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে বৃষ্টির পানি দ্রুত খাল, নালা ও কালভার্ট দিয়ে বের হয়ে যেত। কিন্তু এখন অনেক জায়গায় পানি চলাচলের পথ দখল করে বাড়ি, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় স্বাভাবিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে যাচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাও বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। বোরো কাটার পর পতিত সময়কে কাজে লাগিয়ে কম সেচে স্বল্পমেয়াদি সম্পূরক ফসল হিসেবে আউশ চাষ বাড়ানো হচ্ছে। এবার জেলায় ১ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে, যা মধ্য আগস্ট থেকে কৃষকরা ঘরে তুলতে পারবেন।

তিনি বলেন, "মৌসুমের শুরুতে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় কিছু এলাকায় আমনের চারা রোপণে সাময়িক ধীরগতি দেখা দিয়েছে। তবে আগস্ট মাসের মধ্য পর্যন্ত রোপণের উপযুক্ত সময় থাকবে। পানি নেমে গেলে কৃষকরা দ্রুত কাজ শেষ করতে পারবেন।"

তিনি আরও জানান, মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছেন। আউশ ধান কাটার পর সেই জমিতেই দ্রুত আমনের চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখনও সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু বৃষ্টিকে দায়ী না করে খাল-নালা ও কালভার্টের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে নীলফামারীর কৃষিকে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থেকে রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন