মঙ্গলবার
০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধি, ক্ষোভে ফুঁসছেন যাত্রীরা

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬, ০২:২০ পিএম
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বাস।
expand
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বাস।

তীব্র আন্দোলন ও হরতালের হুঁশিয়ারির মুখে কমানো হয়েছিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী দুটি যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া। কিন্তু কয়েক মাসের মাথায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাড়া আবারও ৫ টাকা বাড়িয়ে ৫৫ টাকা করা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যাত্রীরা।

যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাসভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে তারা অবগত নন। তাদের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান।

এদিকে, বাসভাড়া বাড়ানোয় ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। তারা জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। গত তিন দিন ধরে সিটি বন্ধন পরিবহন ও উৎসব ট্রান্সপোর্টের বাসগুলোতে চলাচল করতে ৫৫ টাকা করে ভাড়া পরিশোধ করছেন যাত্রীরা, যা আগে ছিল ৫০ টাকা।

বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এ রুটে সর্বোচ্চ ২ টাকা ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়তে পারে, কিন্তু মালিকরা বাড়িয়েছেন ৫ টাকা।

পরিবহন মালিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে আগে বেসরকারি কয়েকটি পরিবহনের বাস চলাচল করলেও বর্তমানে সিটি বন্ধন পরিবহন ও উৎসব ট্রান্সপোর্টের শতাধিক বাস চলাচল করছে। এ পথে ৪৫ টাকায় নন-এসি বাসে যাত্রী পরিবহন করা হলেও কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে ভাড়া এক লাফে বাড়িয়ে ৬০ টাকা করা হয়। পরে তা কমিয়ে ৫৫ টাকা করা হয়।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জে বাসভাড়া কমানোর দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে নারায়ণগঞ্জ যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম। তারা আধাবেলা হরতালেরও ঘোষণা দেন।

পরে হরতালের এক দিন আগে, ১৬ নভেম্বর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বাস মালিক ও যাত্রী অধিকার ফোরামের সঙ্গে বৈঠক করে বাসভাড়া কমিয়ে ৫০ টাকা নির্ধারণ করেন।

এই সিদ্ধান্তের নয় মাসের মাথায় গত বছরের ২০ আগস্ট বাসভাড়া পুনরায় বাড়ানো হয়। যদিও নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা পথে সরকারি পরিবহন বিআরটিসির বাসগুলোতে ভাড়া ৪৫ টাকা রয়েছে।

সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখে সেবারও ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন বাস মালিকরা। ভাড়া বাড়ানোর তৃতীয় দিনের মাথায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বর্ধিত ৫ টাকা ভাড়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।

ফলে, গত কয়েক মাস ৫০ টাকায় যাত্রীরা চলাচল করলেও গত ১ মে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভাড়া ৫৫ টাকা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।

এ পথে নিয়মিত যাতায়াত করেন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মাহফুজুর রহমান। হঠাৎ ভাড়া বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তেলের দাম বাড়ছে ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়েনি। আমরা লাখ লাখ টাকা আয় করি না। হিসাব করে সংসার চালাই। হুট করে ভাড়া বাড়লে সেই হিসাবে গড়মিল হয়ে যায়।”

নারায়ণগঞ্জ যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, সরকার নির্ধারিত হিসাবে ১৮ কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ে ১ টাকা ৯৮ পয়সা। তবে পরিবহন মালিকরা দূরত্ব সাড়ে ১৯ কিলোমিটার দাবি করলেও সে অনুযায়ী ভাড়া বাড়ে ২ টাকা ১৮ পয়সা। কিন্তু তারা ৫ টাকা বাড়িয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, “সাধারণত গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যাত্রীদের আলোচনা হয়। কিন্তু এবার তা হয়নি। আমরা এই প্রক্রিয়ার নিন্দা জানাই।”

গণসংহতি আন্দোলনের জেলা কমিটির সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম সুজন অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আন্দোলনের মুখে ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে থাকলেও এবার তা অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “বাস মালিকরা জেলার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ভাড়া বাড়িয়েছেন। এমনকি প্রশাসনকেও উপেক্ষা করা হয়েছে। আগের মতোই পরিবহন খাতে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় জনগণের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।”

তবে বাসভাড়া বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলে দাবি করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি রওশন আলী। তিনি বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক দিয়ে চলাচলকারী বন্ধন ও উৎসব পরিবহনের বাসগুলো তেলে চলে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়া উপায় ছিল না।

তিনি আরও বলেন, “৫৫ টাকা ভাড়া আগেও ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর তা অন্যায়ভাবে কমানো হয়েছিল। এবার তেলের দাম বাড়ায় আমরা প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলাম। তারা কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় মালিকরা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ৫ টাকা বাড়িয়েছে। নীতিগতভাবে এটি সঠিক।”

তবে অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্য পথে চলাচলকারী আনন্দ পরিবহনের ভাড়া অপরিবর্তিত রয়েছে। কারণ, এসব বাস গ্যাসে চলে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “বাসভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে হয়। সেখানে কিলোমিটারভিত্তিক হার নির্ধারণ করা থাকে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে আমাদের জানানো হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন