

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আজ ১৭ এপ্রিল, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে এই স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।
মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
বিগত সরকারগুলোর আমলে আড়ম্বরতার সাথে পালিত হতো দিবসটি। সপ্তাহখানেক আগে থেকেই মেহেরপুরে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। মুজিবনগরের আম্রকানন থাকত লোকে-লোকারণ্য। আলোকসজ্জা আর কুচকাওয়াজের মহড়ায় মুখরিত থাকত চারপাশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংক্ষিপ্ত আকারে মুজিবনগর দিবস পালন করা হয়েছে।
তবে এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ১৭ বছর পর এবার মুজিবনগর দিবস পালনের রাষ্ট্রীয় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সরকারি কোন নির্দেশনা না থাকায় কোন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে অনেকটা নিরবেই পার হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের এই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে সেখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্মৃতি কমপ্লেক্সে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে উপস্থাপন করা হয়। কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির স্মারক ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছিল।
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী মানচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে ভাগ করে প্রায় ৬০০টি ভাস্কর্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে যেতেন ঐতিহাসিক মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে।
অথচ সেই ভাস্কর্যের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ (ছোট-বড় ৩০০টি ভাস্কর্য) দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ভাস্কর্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এখানে-সেখানে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর সারাদেশের মতো মেহেরপুরের মুজিবনগরে ছাত্র-জনতা আনন্দ মিছিল করতে রাস্তায় নেমে আসেন। এ সুযোগে কিছু দুষ্কৃতকারী মুবিজনগর সরকারের শপথ স্থানে নির্মিত ভাস্কর্য ভাঙচুর করে। এসব ক্ষত বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উৎসবমুখর পরিবেশ না থাকায় তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনীতির পটপরিবর্তন বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কারণেই হয়তো এবার আয়োজন সীমিত।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, ‘মন্ত্রণালয় থেকে এখনো মুজিবনগর দিবস সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা আসেনি। আমরা নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।’
সচেতন মহল বলছেন, সরকারের পরিবর্তন বা রাজনৈতিক পটভূমি যাই হোক না কেন, মুজিবনগর দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৭ এপ্রিলের সেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানই বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছিল যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সরকার ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত জনযুদ্ধ।
স্মৃতিসৌধের সেই ২৩টি স্তম্ভ আজও যেন নীরবে মনে করিয়ে দেয় শোষণ আর সংগ্রামের ইতিহাস। আয়োজন জাঁকজমক হোক বা না হোক, বাঙালির হৃদয়ে ১৭ এপ্রিলের চেতনা অমলিন থাকবে বলেই মনে করেন সচেতন মহল।
মন্তব্য করুন