

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টিলার ওপর গড়ে ওঠা ত্রিপুরা পল্লীর ২৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ছড়ার প্রবল স্রোত ও মাটি ধসের কারণে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাদের বসবাসের টিলা। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভাঙনে ইতোমধ্যে টিলার বড় একটি অংশ ধসে পড়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে পল্লীবাসীর ঘরবাড়ি, চলাচলের পথ এবং পুরো বসতি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত ত্রিপুরা পল্লীর চারপাশের মাটি ধসে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পল্লী থেকে বের হওয়ার একমাত্র ব্রিজটির এক পাশের মাটি সরে গিয়ে সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয়দের বিকল্প দুর্গম পথ ব্যবহার করে চলাচল করতে হচ্ছে।
পল্লীবাসীরা জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের আতঙ্ক বেড়ে যায়। টানা বৃষ্টিপাত শুরু হলেই টিলার বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ে। পাহাড়ি ছড়ায় পানি বাড়লে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়াও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান চিত্তরঞ্জন দেববর্মা বলেন, “এই পাহাড়ে আমাদের জন্ম, আমাদের জীবন-জীবিকা সবকিছু। জায়গাটি আমাদের কাছে শুধু বসবাসের স্থান নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমরা কখনো টিলা কাটিনি, বরং রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে টিলা ধসে এখন আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ছোটবেলায় যেসব ছড়া ছোট দেখেছি, এখন সেগুলো বড় হয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। প্রতি বর্ষায় টিলা ধসে নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সামনের দিনগুলো নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।”
চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী সন্ধ্যা রাণী দেববর্মা জানান, ২০১৭ সালে প্রথম বড় ধরনের টিলা ধস শুরু হয়। তখন তিনটি পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে আরও দুটি পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে পুরো টিলাটিই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, “দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে। এই টিলাগুলো শুধু মানুষের বসবাসের জায়গা নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। টিলা ধসে গেলে পরিবেশেরও বড় ক্ষতি হবে।”
পল্লীর আরেক বাসিন্দা শাহিন দেববর্মা বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টি হলেই টিলা ধসে পড়ে। এভাবে ধসে ধসে প্রায় অর্ধেক টিলা বিলীন হয়ে গেছে। যাতায়াতের একমাত্র ব্রিজটিও এখন ঝুঁকিতে। দ্রুত স্থায়ী প্রকল্প নেওয়া না হলে পুরো পল্লী হারিয়ে যেতে পারে।”
বাংলাদেশ বন বিভাগের সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদি হাসান বলেন, “সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে ত্রিপুরা পল্লীসহ আশপাশের টিলাগুলো ধসে পড়ছে। গাছপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পল্লীর একমাত্র ব্রিজটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দ্রুত টিলা সংরক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ এবং ব্রিজ সংস্কার জরুরি।”
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, “ত্রিপুরা পল্লী রক্ষায় টিলা সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্র দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করা হবে। উপজেলা প্রশাসন সবসময় পল্লীবাসীর খোঁজখবর রাখছে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের পাশে থাকবে।”
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সাতছড়ির এই ত্রিপুরা পল্লী এখন অস্তিত্ব সংকটে। কয়েক প্রজন্ম ধরে পাহাড়, বন আর ছড়ার সঙ্গে মিশে থাকা এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসতি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।