

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর এক ‘আয়নাবাজি’র ঘটনার এবার সমাপ্তি ঘটেছে। পরিচয় জালিয়াতির শিকার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর আদালতের চারটি শর্তে জামিন পান তিনি।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান বলেন, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সোনা মিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত সোনা মিয়াকে চারটি শর্তে জামিন দেন বলে জানিয়েছেন আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নাজির) মো. বেদারুল আলম।
আদালতের শর্তগুলো হলো সোনা মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখা, আদালতের অনুমতি ছাড়া ঠিকানা পরিবর্তন না করা, নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজিরা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত রাখা। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রতি তিন মাস পর তাঁর উপস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে থানাকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০২২ সালের ১৩ জুন সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে প্রকৃত আসামি মো. রমজান ওই মামলায় জামিন নিয়ে আত্মগোপন করেন। তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ মো. রমজানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় রমজান নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় দেন এবং সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেন। পরে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলার পাঁচ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
গত ২৪ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রকৃত অপরাধী রমজানের পরিবর্তে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সোনা মিয়া। এরপরই বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর দাবি করেন, ইয়াবা মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন তিনি।
কারাগার কর্তৃপক্ষও পুরোনো মামলার নথিতে থাকা ছবি, পরিচয়, মায়ের নামসহ বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে সোনা মিয়ার তথ্য মিলিয়ে অসংগতি দেখতে পায়। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে জেলা ও দায়রা জজ পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া ছিলেন না। তিনি রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রমজান। সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজের পরিচয় গোপন করে ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হন রমজান। সেই ভুল পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই মামলা, অভিযোগপত্র ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী তদন্ত করে গত ৫ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ২০২০ সালের ইয়াবা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নন। ওই মামলায় সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রমজান।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সোনা মিয়ার আইনজীবী আবদুল মান্নান বলেন, মামলার তদন্ত পর্যায়েই আসামির প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা হয়নি। এর ফলেই একজন নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুদণ্ডের আসামি হিসেবে কারাগারে যেতে হয়েছে। বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পর জামিনের আবেদন করা হয়। নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন।
শুক্রবার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফেরেন পরিচয় জটিলতায় কারাভোগ করা দিনমজুর সোনা মিয়া। কারাফটকে স্বজনেরা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন।

