

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


‘কোনো মহিলা ডাক্তারকে স্যার-ম্যাডাম ছাড়া অন্য কিছু ডাকবেন না’ কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের সামনে টাঙানো এমন একটি নির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চিকিৎসকদের কীভাবে সম্বোধন করতে হবে, তা নিয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা দেওয়ার কারণ নিয়েও রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা আলোচনা-সমলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই বলছে, চিকিৎসকদের ‘স্যার-ম্যাডাম’ বলতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সম্প্রতি মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা নবীপুর এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমরা গ্রামের মানুষ। মহিলাগোরে আপা আর পুরুষদের ভাই বইল্যা ডাকি। এই হাসপাতালের ডাক্তাররারে ভাই বা আপা কইলে তারা চেইত্যা যায়। সেবা দেওনের বদলে উল্টা রাগারাগি করে।’
স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আঞ্চলিক ভাষা ও প্রচলিত সামাজিক রীতি অনুযায়ী অনেকেই নারী চিকিৎসকদের ‘আপা’ এবং পুরুষ চিকিৎসকদের ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। তাঁদের দাবি, এ ধরনের সম্বোধনের মধ্যে চিকিৎসকদের অসম্মান করার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। বরং গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই এভাবে সম্বোধন করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী জানান, কয়েক মাস আগে হাসপাতালে নতুন কয়েকজন নারী চিকিৎসক যোগ দেওয়ার পর এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমিও একবার এক নারী চিকিৎসককে আপা বলে সম্বোধন করেছিলাম। এতে তিনি রাগান্বিত হন এবং পরে ‘ম্যাডাম’ অথবা “স্যার” বলে সম্বোধন করতে বলেন।’ এদিকে হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এমন নির্দেশনা দেওয়ার কারণে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার পাশাপাশি রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নারী চিকিৎসকের কারণে ওই নির্দেশনাটি টাঙানো হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নন মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতালে নবীন কয়েকজন নারী ডাক্তার আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে কারও কারণে এমন নির্দেশনা দরজায় লাগানো হয়েছে বলে শুনেছি। তবে নির্দিষ্ট কোনো ডাক্তার বা কোন নারী চিকিৎসকের কারণে এমন অদ্ভুত নির্দেশনা লাগানো হয়েছে, সেটি আমি খতিয়ে দেখছি।’ এর আগে আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছিলেন, রোগীদের চিকিৎসকদের ‘স্যার-ম্যাডাম’ বলতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। জরুরি বিভাগের দরজায় টাঙানো নির্দেশনাটি তাঁর নজরে এসেছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সেটি অপসারণ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার কথা জানান। সিভিল সার্জন বলেন, ‘আমি চাকরি করি মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য। এটাই আমার দায়িত্ব। আমাকে কেউ ‘তুই’ বলে সম্বোধন করলেও আমি কিছু মনে করি না। মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টির বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখব। কোনো ডাক্তারকে স্যার ও ম্যাডাম বলে ডাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’ রোগী ও স্বজনদের মতে, চিকিৎসা নিতে এসে একজন রোগী চিকিৎসককে কীভাবে সম্বোধন করছেন, তার চেয়ে চিকিৎসকের আচরণ, রোগীর প্রতি সম্মান এবং মানবিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রত্যাশা, সম্বোধন নিয়ে অস্বস্তি বা ভীতি নয় সরকারি হাসপাতালে সবার জন্য নিশ্চিত হবে স্বাভাবিক ও রোগীবান্ধব চিকিৎসাসেবা।


