

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মাঠে নুয়ে পড়া পাকা ধানে গজিয়েছে চারা। আর পানির মধ্যে থাকা সেই ধান যত্নের সাথে কাটছেন শ্রমিকরা।চরা দামে নেওয়া শ্রমিকদের কাটা গজানো এই ধান কৃষকের তেমন কোন কাজ আসবে না। কারণ এই ধান যেমন বিক্রি করা যাবে না, তেমনি এই ধান থেকে তৈরি চালের ভাতও হবে খাওয়ার অনুপযোগী। মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামের শেখ রুস্তম আলীর ধান খেতের দৃশ্য দেখা যায়।
হতদরিদ্র এই কৃষক এবার ২ একর ৫০ শতক জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন।ভারি বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে তার খেতের অন্তত ২ একর জমির ধান নুয়ে পড়েছে। আর নুয়ে পড়া সব ধানেই চারা গজিয়েছে। শুধু রুস্তম নয়, পুরো জেলা জুড়ে বেশিরভাগ ধান চাষীর খেতের একই অবস্থা। গেল তিন দিন ধরে বৃষ্টি না থাকলেও, জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে চারা গজিয়েছে নুয়ে পড়া পাকা ধানে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে অন্তত ১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। তবে বাস্তবিক অর্থে এই পরিমান আরও অনেক বেশি। ক্ষতিগ্রস্থ অনেক কৃষকের তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক শেখ রুস্তম আলী বলেন, আড়াই একর জমি করতে এক লক্ষ ২০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।ঝড় বৃষ্টি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে এই ধান কেটে মাড়াই করতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগত।কিন্তু এখন এই ধান ঘরে তুলতে অন্তত ৮০ হাজার টাকা লাগবে। এবার যে কি হবে জানি না, গরুর জন্য কুটা না লাগলে ধানই কাটতাম না। নিজের জমি না হলেও, এবার পথে বসা লাগত বলে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়েন মাঝ বয়সী এই কৃষক।
একই গ্রামের কৃষক মোজাফফের মোল্লা বলেন, নিজের তো জমি নেই। ২০ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে এক বিঘা জমি করেছিলাম।বৃষ্টিতে নুয়ে পড়া সব ধানেই চারা হইছে। এলাকার সবার ধানেরই একই অবস্থা, দিনে ১ হাজার টাকা দিয়েও কোন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।মাদরাসায় পড়া ছেলেকে নিয়ে ধান কাটতে নেমেছি।
দেড় বিঘার মাছের ঘেরে বোরো ধান লাগিয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলার উৎকুল গ্রামের চাষী হুমায়ুন কবির।শ্রমিকের অভাবে পানির নিচে থাকা ধান তো উঠাতেই পারেননি, অন্যদিকে ধান ও নাড়া পঁচা পানিতে ঘেরের মাছ মরে যাচ্ছে বলে জানান এই কৃষক। হুমায়ুন কবির বলেন, ধান তো গেছেই। কুটাও ঘরে যাবে না। আর ঘেরে থাকা চিংড়ি ও সাদা মাছ মরা শুরু করেছে। জাল টেনে কিছু বিক্রি করেছি। এবারের বৃষ্টিতে আসলে আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। এদিকে যেসব কৃষক অনেক কষ্ট করে ধান ঘরে তুলেছেন, তাদের বিক্রি করতে হচ্ছে অনেক কম দামে। গেল বছর যেখানে খোলা বাজারে যেখানে ধানের মন ৯শ থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে এবার সেই ধান বিক্রি হচ্ছে ৬শ থেকে ৮শ ৫০ টাকা।
ধান চাষী আমির হাওলাদার বলেন, এবার ধান অনেক ভাল হয়েছিল। বৃষ্টি ও বাতাসে ধান ঝড়ে যাওয়ার পরেও দুই বিঘা জমিতে ৮০ মন ধান পেয়েছি। তবে ধান ভিজা থাকায় দাম একদম নেই বললেই চলে। ৭৫০ টাকা মনে বিক্রি করেছি। খরচের টাকা ওঠা দায় হবে। জেলার অন্তত অর্ধ লক্ষ বোরো চাষীর অবস্থা রুস্তম, হুমায়ুন, আমির ও মোজাফফরের মত। প্রত্যেকেরই এবার লোকসান গুনতে হবে।
কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে। সরকার যদি কখনও কোন প্রনোদনা দেয়, তাহলে এই কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাগেরহাটের উপ-পরিচালক মোঃ মোতাহার হোসেন বলেন, বৃষ্টির পরে আমরা মাঠ পরিদর্শন করেছি। অনেক কৃষকের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না, মজুরীও অনেক বেশি। আর খোলা বাজারে ধানের দামও বেশ কম। তবে আর বৃষ্টিপাত না হলে, চাষীরা কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি প্রনোদনা বা সরকারি ভাবে কোন সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ হয়, তাহলে এসব চাষীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।