শনিবার
৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠাকুরগাঁওয়ে নয় মাসের ব্যবধানে তিন প্রবীণ নেতার বিদায়

পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ১২:২১ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে তিনটি সংসদীয় আসনের তিনজন প্রবীণ ও শীর্ষ নেতাকে হারিয়ে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁও জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে মাস—এই সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক তিন সংসদ সদস্যের চিরবিদায়ে জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

জেলার উন্নয়ন, দলীয় রাজনীতি ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তিন নেতা হলেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম এবং ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাবেক এমপি ইমদাদুল হক।

স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে একের পর এক এই তিন নক্ষত্র হারিয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

এই তিন নেতার মৃত্যুর সময়ের ব্যবধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইমদাদুল হকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জেলাজুড়ে শোকের আবহ শুরু হয়। এর ঠিক ৫ মাস ৮ দিন পর, চলতি ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন।

রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুর পর শোকের আবহ কাটতে না কাটতেই মাত্র ৩ মাস ২১ দিনের ব্যবধানে জেলার রাজনীতিতে আরেকটি বড় ধাক্কা আসে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ২০২৬ সালের ঈদের দিন ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম। সব মিলিয়ে মাত্র ৮ মাস ২৮ দিনের (প্রায় ৯ মাস) ব্যবধানে এই তিন বর্ষীয়ান নেতা দুনিয়া বিদায় নিলেন।

রমেশ চন্দ্র সেন ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা। ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রমেশ চন্দ্র সেন ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই নেতা কেন্দ্রীয়ভাবে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নির্বাচনী বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি পানিসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রী থাকাকালে নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও জেলার শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও কৃষি উন্নয়নেও তার বড় অবদান রয়েছে।

এদিকে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে টানা ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দবিরুল ইসলামের ঝুলিতে। ১৯৪৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই নেতার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মাধ্যমে। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) থেকে ১৫-দলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি।

একই বছর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জয়ী হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে পরাজিত করে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দবিরুল। তবে ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে দবিরুলের বদলে তাঁর ছেলে মাজহারুল ইসলামকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে মাজহারুল ইসলাম জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা দবিরুল ইসলাম সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে চা চাষ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখা এই নেতা ‘রণবাগ ইসলামী টি এস্টেট’-এর মালিক ছিলেন।

অন্যদিক ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রাণীশংকৈল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইমদাদুল হকও ছিলেন জেলার একজন সুপরিচিত ও জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা। ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

স্থানীয় রাজনীতিতে সাংগঠনিক দক্ষতা ও তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে এলাকায় তার একটি শক্ত অবস্থান ছিল। পরবর্তীতে তিনি পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।

সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানে জেলার শীর্ষ এই তিন নেতার চিরবিদায়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের আবহ বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন