বুধবার
০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরানে হামলা করে মাকড়সার জালে আটকে গেছেন ট্রাম্প?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

ইরান ট্রাম্পের জন্য মাকড়সার জাল হয়ে আসতে পারে বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই এখন অনেক বেশি। ট্রাম্পের শুরু করা খেলা যেকোনো সময় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সিএনএনের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে তেমন ইঙ্গিতই দেয়া হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের আকাশে যখন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা দিচ্ছিল, তখন থেকেই বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন এবং ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযানকে পেন্টাগন'আমেরিকা ফার্স্ট নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছেন, এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে আমেরিকার শর্তে। তবে ইতিহাসবিদরা এই বার্তার মধ্যে ২০০১ সালের জর্জ ডব্লিউ বুশের সেই দম্ভোক্তির প্রতিধ্বনি খুঁজে পাচ্ছেন যা দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল মার্কিন বাহিনীকে।

ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। আর এতে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে আমূল বদলে গেছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ অভিযান এমন এক জুয়া যা সফল হলে ইরানের দীর্ঘ ৫০ বছরের শত্রুতার অবসান ঘটতে পারে কিন্তু ব্যর্থ হলে পুরো অঞ্চল এক দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতার কবলে পড়বে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের নাগরিকদের স্বাধীনতার পথ দেখাতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি ছাড়া শুরু হওয়া এই যুদ্ধ আমেরিকার জন্য হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ মতে, চলমান এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি ভিন্ন সম্ভাবনা কাজ করছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ধারণাটি হলো, ইরানি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর ক্রমাগত বিমান হামলার ফলে সেখানে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটবে যা একটি নতুন ও স্থিতিশীল ইরান গঠন করবে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসার পথ প্রশস্ত হবে। তবে বাস্তববাদী অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্ব হয়তো নতুন কোনো শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে যা আমেরিকার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়েই থাকবে। অন্তত সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে নিষ্ক্রিয় রাখাই এখন ওয়াশিংটনের মূল কৌশলগত লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে।

সবচেয়ে ভীতিজনক পরিস্থিতি হতে পারে যদি ইরান লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়। যদি দেশটিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয় এবং পরমাণু কর্মসূচিগুলোর নিয়ন্ত্রণ উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় পুরো বিশ্বের জন্য এক ভয়াবহ শরণার্থী সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা দিচ্ছে। ট্রাম্প কখনো বলছেন, এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের জন্য, আবার কখনো বলছেন এটি সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য। এই অসংলগ্ন যুক্তিগুলো যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো দেশে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা বা শাসন পরিবর্তন নিশ্চিত করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার মডেলে ইরানে পরিবর্তন আনতে চাইলেও তেহরানের শাসন কাঠামো অনেক বেশি জটিল। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে এমন কোনো মধ্যপন্থী নেতার আবির্ভাব এখনো ঘটেনি যার সাথে ওয়াশিংটন আলোচনা করতে পারে। বরং এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ইরানের কট্টরপন্থীরা আরও বেশি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে।

তবে যুদ্ধের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানকে রাশিয়া ও চীনের অক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ইরান যদি তার সামরিক সক্ষমতা হারায় তবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ড্রোন ও মিসাইল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাব আবার পুনপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের ধারণা। তবুও অতীতের আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভ করা আর একটি দেশ পুনর্গঠন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি চ্যালেঞ্জ।

ইরানি জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও বর্তমানে দেশটির কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পাচ্ছে না। কট্টরপন্থী বাসিজ বাহিনী বা রেভল্যুশনারি গার্ডস এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা যেকোনো বিদ্রোহ দমনে অত্যন্ত নৃশংস হতে পারে। এই যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ না হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এই পথ বেছে নিয়েছেন কিন্তু জনমতের জরিপে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ আমেরিকান এই অভিযানের বিপক্ষে।

শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত। মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য একটি দ্রুত বিজয় অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু ইরান এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকেই হুমকির মুখে ফেলার কৌশল নিতে পারে। পেন্টাগন যাই দাবি করুক না কেন, এই আগুনের লেলিহান শিখা কতদূর ছড়াবে তা কারো নিয়ন্ত্রণে নেই।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন