শনিবার
২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্যায় বিদেশি সহায়তা নিয়ে নতুন যে সিদ্ধান্ত নিল নেপাল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

চীনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের খুঁজে বের করতে বিদেশি সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে সীমিত পরিসরে বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং বিশেষজ্ঞদের কাজের অনুমতি দিয়েছে দেশটির সরকার।

নেপাল সরকার বুধবার জানিয়েছিল, বন্যার পর অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানোর মতো যথেষ্ট সক্ষমতা নেপালি উদ্ধারকারী দলগুলোর রয়েছে। তাই বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে এক দিনের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। সরকার এখন বিশেষ কিছু কাজে বিদেশি সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে টানেলের ভেতর থেকে উদ্ধারকাজ, ডিএনএ পরীক্ষা এবং ফরেনসিক পরীক্ষা। নেপালের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা দ্য কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নেপালের ওপর ব্যাপক চাপ ছিল। কারণ, বন্যার পর বিভিন্ন দেশের নাগরিকও নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের খুঁজে বের করতে অন্তত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং কিছু বিশেষজ্ঞকে নেপালে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিতসংখ্যক বিদেশি বিশেষজ্ঞকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল রয়টার্সকে বলেন, চীনের সঙ্গে হিমালয় সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার পর কিছু বিশেষায়িত ও কারিগরি কাজে নেপালের বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে নেপালের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। তবে সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্য বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে।

বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিধসের কারণেও অনেক এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত বন্যায় ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও ১ হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয়। তাদের সংখ্যা ২৮৮ জন। এ ছাড়া ১০০ জন চীনা, ৬৫ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৫ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের মূল্যায়নের ভিত্তিতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তা নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এই চার দেশের বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি কর্মীরা টানেলের ভেতর থেকে উদ্ধারকাজ, ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক পরীক্ষায় সহায়তা করবেন। এ ছাড়া আরো কয়েকটি দেশ নেপালকে ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর আগ্রহ জানিয়েছে। তবে নেপাল সব দেশের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। কাঠমান্ডুতে অন্তত দুটি বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ নাগরিকদের খুঁজে বের করতে তারা বারবার বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর অনুমতি চেয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা ইতিবাচক সাড়া পাননি।

বন্যায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। ২১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পে শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত ৫৭৬ জন শ্রমিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুর্যোগের সময় প্রকল্পটিতে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। নেপালের স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি উত্তম ভ্লোম বলেন, ৫৭৬ জনের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তারা কোথায় আছেন, সে সম্পর্কেও পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নিখোঁজ শ্রমিকদের কেউ যদি টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকেন এবং উদ্ধারকারী দল দ্রুত সেখানে পৌঁছাতে পারে, তাহলে তাদের বাঁচানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় মোবাইল ও টেলিফোন নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তারা জীবিত আছেন কি না, তা জানার কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে ব্যক্তিমালিকানাধীন হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করছে নেপাল সরকার। তবে অনেক জায়গায় হেলিকপ্টার নামানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এ ছাড়া কারিগরি ও নিরাপত্তার সমস্যাও রয়েছে। ফলে আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালানোও সহজ হচ্ছে না। নেপালকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। এর মধ্যে রয়েছে একটি টানেল উদ্ধারকারী দল, একটি চিকিৎসক দল এবং ভারতের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর সদস্য। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ তথ্য জানিয়েছেন। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি নেপালকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানান। জয়শঙ্কর আরো জানান, মানবিক সহায়তার তৃতীয় চালান নিয়ে একটি বিমান কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ওই চালানে ১০ টন ত্রাণসামগ্রী রয়েছে। এর মধ্যে বহনযোগ্য জেনারেটর, মর্যাদা কিট, খাবারের প্যাকেট এবং পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট রয়েছে। ভারতের চতুর্থ দফার ত্রাণসামগ্রীর সঙ্গে ১১ সদস্যের একটি দলও নেপালে পাঠানো হয়েছে। দলটিতে চিকিৎসক, প্যারামেডিক এবং টানেলের ভেতর থেকে উদ্ধারকাজে বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন।

নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াও। দেশটির নয়জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সিউল এই প্রস্তাব দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন জানিয়েছেন, কাঠমান্ডুতে থাকা কর্মকর্তাদের তিনি কোরীয় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দলের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিশ্চিত করতে বলেছেন। যাতে দলটি নেপালে গিয়ে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে অংশ নিতে পারে। তিনি আরো জানিয়েছেন, সিউল কোরিয়ার দুর্যোগ সহায়তা দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রধান কাজ হবে রাসুভা ও নুয়াকোট জেলার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর টানেলে উদ্ধার অভিযান চালানো। এই দুই জেলায় মোট ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিখোঁজ ও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতেও বিদেশি সহায়তা নেবে নেপাল। দেশটির নিজস্ব পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ডিএনএ নমুনা দ্রুত পরীক্ষা করা কঠিন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল জানিয়েছেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বিপুলসংখ্যক নমুনা পরীক্ষায় নেপালকে সহায়তা করবেন। এর ফলে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পরে তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা যাবে। ভয়াবহ বন্যার পর নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নেপালের ওপর উদ্ধারকাজ দ্রুত শেষ করার চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান শনাক্ত করতে ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন