


জীবনের প্রতিটি দিনই আমাদের নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখন কোথায় যাব, কোন কাজটি আগে করা প্রয়োজন, ঝুঁকি নেওয়া উচিত কি না—এমন অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে আমাদের দৈনন্দিন জীবন। মানুষ নিজেকে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে মনে করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি আমাদেরও হয়ে থাকে।
তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছুই রয়েছে ক্ষুদ্র পোকামাকড়ের আচরণে। আকারে অত্যন্ত ছোট মস্তিষ্ক নিয়েও পিঁপড়ে, মৌমাছি, ঘাসফড়িং, তেলাপোকা এমনকি ফলের মাছির মতো পোকামাকড় পরিস্থিতি বুঝে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, এসব পোকামাকড়ের আচরণ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন কিছু কার্যকর নীতি পাওয়া গেছে, যা মানুষের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, পোকামাকড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন কম্পিউটার অ্যালগরিদম। এসব প্রযুক্তি বর্তমানে পরিবহন, যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, পোকামাকড় আমাদের কী শেখাতে পারে।
১. পিঁপড়ের কাছ থেকে শিখুন—সবচেয়ে ভালো পথ খুঁজে নিন
একসঙ্গে অনেক বিকল্প সামনে এলে আমরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে যাই। কোনটি সবচেয়ে ভালো, তা বুঝতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই কঠিন হয়ে ওঠে। একে বলা হয় ‘চয়েস ওভারলোড’ বা অতিরিক্ত বিকল্পের কারণে সিদ্ধান্তহীনতা।
পিঁপড়েদেরও এমন সমস্যায় পড়তে হয়। খাবারের জন্য কোন জায়গায় গেলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে, তা খুঁজতে একসঙ্গে অনেক পিঁপড়ে বের হয়। তারা শুরুতে বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে পড়ে এবং সম্ভাব্য জায়গাগুলো খুঁজে দেখে।
যে পথে খাবারের সন্ধান পাওয়া যায়, সেই পথে চলার সময় পিঁপড়েরা মাটিতে এক ধরনের রাসায়নিক গন্ধ বা ফেরোমোন রেখে যায়। অন্য পিঁপড়েরা সেই গন্ধ অনুসরণ করে।
মজার ব্যাপার হলো, যে পথ সবচেয়ে ছোট এবং কার্যকর, সেটি ব্যবহার করে পিঁপড়েরা দ্রুত বাসায় ফিরতে পারে। ফলে সেই পথে বেশি ফেরোমোন জমা হয়। সময়ের সঙ্গে পথটি আরও শক্তিশালী সংকেত তৈরি করে এবং আরও বেশি পিঁপড়ে সেটি অনুসরণ করে।
অন্যদিকে দীর্ঘ বা কম কার্যকর পথের ফেরোমোন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
এভাবে কোনো একজন পিঁপড়ে পুরো বিষয়টি না বুঝলেও পুরো দল মিলে সবচেয়ে কার্যকর পথটি বেছে নেয়।
গবেষক মার্কো ডোরিগোর মতে, এর বড় শিক্ষা হলো—কেন্দ্রীয়ভাবে কেউ নির্দেশ না দিলেও সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে একটি দল কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
পিঁপড়ের এই কৌশল থেকেই তৈরি হয়েছে ‘অ্যান্ট কলোনি অপটিমাইজেশন’ পদ্ধতি। এটি রেলপথ পরিকল্পনা, পরিবহন, যোগাযোগব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমাধান খুঁজতে ব্যবহার করা হয়েছে।
২. মৌমাছির কাছ থেকে শিখুন—সবার মতামত শুনুন
নতুন বাসা কোথায় বানাবে, সেটিও মৌমাছিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে।
কয়েকটি মৌমাছি নতুন বাসার সম্ভাব্য জায়গা খুঁজতে বের হয়। তারা বিভিন্ন স্থান পরীক্ষা করে বাসায় ফিরে আসে। এরপর অন্য মৌমাছিদের সামনে নিজেদের পছন্দের জায়গার তথ্য দেয় একটি বিশেষ নাচের মাধ্যমে।
এটি ‘ওয়্যাগল ড্যান্স’ নামে পরিচিত। নাচের ধরন দেখে অন্য মৌমাছিরা বুঝতে পারে নতুন জায়গাটি কত দূরে, কোন দিকে এবং সেটি কতটা ভালো।
ভালো জায়গা হলে মৌমাছি বেশি সময় ও জোর দিয়ে নাচে। এরপর অন্য কিছু মৌমাছি সেই জায়গা যাচাই করতে যায়। তারাও ফিরে এসে নিজেদের মতামত জানায়।
শেষ পর্যন্ত কোনো একটি জায়গার পক্ষে পর্যাপ্তসংখ্যক মৌমাছি সমর্থন দিলে সেটিই হয়ে ওঠে পুরো দলের পছন্দ।
মানুষের ক্ষেত্রেও এর শিক্ষা পরিষ্কার—কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু নিজের মতের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন মানুষের মতামত শোনা এবং প্রয়োজন হলে তথ্য যাচাই করা ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে।
৩. ঘাসফড়িং শেখায়—মাঝে মাঝে নিরপেক্ষ থাকাও জরুরি
একটি দলের সবাই যদি নিজের অবস্থানে শক্তভাবে আটকে থাকে, তাহলে মতবিরোধ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন আলোচনা দ্রুত ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।
ঘাসফড়িংয়ের একটি গবেষণা এ ক্ষেত্রে অন্যরকম শিক্ষা দিয়েছে।
খুব ছোট বয়সের ঘাসফড়িং উড়তে পারে না। তাই তারা দল বেঁধে মাটিতে হাঁটে। গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ‘কিট’ ইয়েটস একটি গোলাকার জায়গায় একদল ঘাসফড়িং রেখে দেখেন, তারা কোন দিকে যাবে।
তিনি লক্ষ্য করেন, দলটি মাঝে মাঝে একদিকে চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায় এবং কিছু সময়ের জন্য কোনো দিকেই না গিয়ে নিরপেক্ষ থাকে। এরপর দলটি অন্যদিকে চলা শুরু করতে পারে।
গবেষকের মতে, এই সাময়িক ‘নিরপেক্ষতা’ই দলকে পুরোনো সিদ্ধান্ত থেকে বের হয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
মানুষের ওপরও একই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের দুটি বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়। আবার চাইলে কোনো পক্ষ না নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়। দেখা যায়, নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ থাকলে দল তুলনামূলক দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ সব সময় মত প্রকাশ করতেই হবে—এমন নয়। কখনো একটু থেমে থাকা, পরিস্থিতি নতুন করে দেখা এবং নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করাও ভালো সিদ্ধান্তের অংশ।
৪. তেলাপোকা শেখায়—ভিন্ন ব্যক্তিত্বও কাজে লাগে
একটি দলে সবাই যদি একই ধরনের চিন্তা করে, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সব সময় সহজ বা ভালো হয় না। তেলাপোকার আচরণ নিয়ে গবেষণা এ ক্ষেত্রে মজার একটি শিক্ষা দিয়েছে।
কিছু তেলাপোকা খুব সাহসী ও অনুসন্ধানী। আবার কিছু তেলাপোকা তুলনামূলক ভীতু এবং দ্রুত নিরাপদ জায়গায় চলে যায়।
গবেষক আইজ্যাক প্লানাস-সিতজা কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে তেলাপোকার দলগত আচরণ পরীক্ষা করেন। তিনি এমন দল তৈরি করে দেখেন, যেখানে সব তেলাপোকার আচরণ একই; আবার এমন দলও তৈরি করেন, যেখানে তাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
দেখা যায়, সব তেলাপোকা একই ধরনের আচরণ করলে দল বাস্তব পরিস্থিতির মতো কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বরং বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্ব থাকা দল দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
খুব বেশি সাহসী সদস্য থাকলে সবাই বেশি ঘোরাঘুরি করতে পারে, ফলে নিরাপদ আশ্রয় বেছে নিতে দেরি হয়। আবার সবাই যদি খুব ভীতু হয়, তাহলে দ্রুত আশ্রয় নেওয়া সম্ভব হলেও জায়গাটি ভালো না হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই একটি দলের শক্তি শুধু সবার একমত হওয়ার মধ্যে নয়; বরং ভিন্ন মত ও আচরণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরির মধ্যেও রয়েছে।
৫. মাছি শেখায়—নিজের অনুভূতিকেও হিসাবের মধ্যে রাখুন
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা কখনো যুক্তিকে গুরুত্ব দিই, আবার কখনো নিজের অনুভূতির ওপর ভরসা করি। কোনটি ঠিক, তা সব সময় সহজে বোঝা যায় না।
ফলের মাছি বা ফ্রুট ফ্লাইয়ের আচরণ এ বিষয়ে চমকপ্রদ কিছু তথ্য দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দুটি গন্ধের মধ্যে পার্থক্য কম হলে মাছি সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেয়। অর্থাৎ তারা যেন সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা হিসাব করে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়।
আরও মজার বিষয় হলো, সুস্বাদু কিন্তু কম পুষ্টিকর খাবার এবং তেতো কিন্তু বেশি পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে বেছে নেওয়ার সময় মাছি দুই ধরনের সুবিধা-অসুবিধার হিসাব করতে পারে। প্রয়োজনে অপছন্দের খাবারও গ্রহণ করে বেশি পুষ্টির জন্য।
তবে তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থাও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। যেমন, খুব ক্ষুধার্ত বা চাপের মধ্যে থাকা মাছি ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যরকম আচরণ করতে পারে।
মানুষের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। ক্ষুধা, ভয়, চাপ, অতীত অভিজ্ঞতা কিংবা কোনো বিষয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই নিজের অনুভূতিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য না করে সেটি কেন তৈরি হচ্ছে, তা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট প্রাণী, বড় শিক্ষা
পিঁপড়ে থেকে মৌমাছি, ঘাসফড়িং থেকে তেলাপোকা—ক্ষুদ্র এসব প্রাণীর জীবনযাপন আমাদের দেখায়, ভালো সিদ্ধান্ত সব সময় বড় মস্তিষ্ক বা বিপুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে না।
কখনো বিভিন্ন বিকল্প পরীক্ষা করে সবচেয়ে কার্যকর পথ বেছে নিতে হয়। কখনো অন্যের মতামত শুনতে হয়। আবার কখনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু থেমে যাওয়া দরকার। একটি দলে ভিন্ন মত থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকেও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অর্থাৎ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিল জগতে উত্তর খুঁজতে সব সময় মানুষের দিকেই তাকাতে হবে—এমন নয়। কখনো কখনো উত্তরটি লুকিয়ে থাকতে পারে আমাদের পায়ের নিচে ঘুরে বেড়ানো এক ছোট্ট পিঁপড়ের মধ্যেই।
সূত্র: বিবিসি