বুধবার
১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই অন্ধকার সরকারের তৈরি: নাহিদ ইসলাম

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম
নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
expand
নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

পরিকল্পনাহীনতা ও জ্বালানি ক্রয়ে সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

বিএনপি সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘পরিকল্পনাহীনতা এবং জ্বালানী ক্রয়ের সিদ্ধান্তহীনতা থেকেই সংকট, এই অন্ধকার সরকারের তৈরি।’

বুধবার (১২ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে ‘অলিগার্কদের সরকার’ গড়ে উঠছে। নির্বাচনী ইশতেহারে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’ বলা হলেও ছয় মাসের মধ্যেই সরকার সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারিকরণের নামে নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন নাহিদ।

বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নিয়ে নীতিমালার খসড়া তৈরিতে বিপিসিকে মাত্র চার দিনের সময় দেওয়ার সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি বলেন, একটি জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নীতিমালার খসড়া তৈরিতে চার দিনের সময়সীমা কীভাবে সুশাসনের নমুনা হতে পারে।

নাহিদ আরও দাবি করেন, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মেয়াদের জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করা হয়েছে। এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন এবং দরদাতা সংকট তৈরি হয়ে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি ‘সিন্ডিকেটের দরজা খুলে যেতে পারে’।

জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো অর্থের সংকট রয়েছে সরকারের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন নাহিদ ইসলাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাস্তবে ডলার আছে। নেই ক্রয়ের সময়োপযোগী শিডিউল।’

নাহিদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম কয়েক মাস জ্বালানি আমদানি হলেও পরে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে ক্রয়প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়নি। সেখান থেকেই সংকটের শুরু।

দেশে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ১০ আগস্ট রাত ১টায় লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৬৭১ এবং ৩ আগস্ট ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল।

এছারা সরকার চলমান সংকটের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দায়ী করলেও যুদ্ধ শুরুর আগেই দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের ঘটনাও তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান। একইসঙ্গে দেশের গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ দুটি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সংকট সমাধানে ১৫ দফা প্রস্তাব

১. তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করুন। উন্মুক্ত অংশীজনআলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন।

২. আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে ৪২ দিনে ফিরিয়েআনুন। কম দরদাতা মানে বেশি দাম, এটি প্রাথমিক অর্থনীতি।

৩. বিপিসির সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ক্রয় শিডিউল অবিলম্বে অনুমোদনকরুন এবং সঠিকভাবে ডিমান্ড স্ট্যাডি করে আগামী চার থেকে ছয়টি অর্থনৈতিক প্রান্তিকের (কোয়ার্টার) ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন।

৪. মহেশখালী FSRU দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশকরু

৫. গ্যাস বরাদ্দে ডেটা-ভিত্তিক অগ্রাধিকার সূচক চালু করুন, জ্বালানি-দক্ষ, রপ্তানিমুখী ও শ্রমঘন শিল্প আগে। কে আগে পাবে, কেপরে, সেটি স্বচ্ছ স্কোরে নির্ধারিত হোক, তদবিরে নয়। মধ্যমেয়াদি (৬-১৮ মাস)

৬. বিপিসির একচেটিয়া ভাঙতে বিদ্যমান মনোপলির বিপরীতে নতুন একক মাফিয়া মনোপলি নয়। প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র, একাধিক অংশীদার, স্বচ্ছ জবাবদিহি এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে রেখে আগাতে হবে।

৭. পরিশোধিত তেল আমদানির অনুমতি নয়, অপরিশোধিত তেলআমদানির অনুমতি দিন, শর্ত থাকুক নিজস্ব রিফাইনারি স্থাপনের। শীর্ষ শিল্প গ্রুপের সবাই সমানভাবে আমদানির সুযোগ পাবে, নিজেদের জন্য এবং যারা ডিস্ট্রিবিউশান নেটওয়ার্ক বানাতে পারবে। এতে ডলার সাশ্রয়হবে, দেশে সক্ষমতা তৈরি হবে। পাচার ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এলসি নিয়ন্ত্রণ রাখুন। ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত গতিতে শেষ করুন।

৮. ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণ নিরীক্ষা করুন। প্রতিটি কেন্দ্রের প্রকৃত বিনিয়োগ ও তার বিপরীতে মোট প্রাপ্ত অর্থ মিলিয়ে দেখুন, যারা ইতিমধ্যেই উদ্বৃত্ত তুলে নিয়েছে, তাদের পেমেন্ট বন্ধ করুন। এক ইউনিটও উৎপাদন না করে বছরে ৪৪-৪৮ হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে; অন্যদিকে পিডিবির কাছে আইপিপিদের বকেয়া ২৭-৫০ হাজার কোটি টাকা। আর দায়মুক্তি আইন অবিলম্বে বাতিল করুন। এটাই খাতটির প্রকৃত রক্তক্ষরণের জায়গা।

৯. আইপিপি বকেয়া নিষ্পত্তিতে আঞ্চলিক মডেল দেখুন। ধাপে ধাপেদায় গ্রহণের বিনিময়ে বিতরণ সংস্থাগুলোর জন্য সিস্টেম লস কমানো ওআদায়-দক্ষতা বাড়ানোর বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা দিন।

১০. বিদ্যুৎ বিলে স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করুন, ম্যানুয়াল রিডিংআর নয়। বিদ্যুতে সিস্টেম লস প্রায় ৯ শতাংশ, গ্যাসে ৬.৩৮ শতাংশ।সিস্টেম লস চুরির সমানুপাতিক, এবং এই চুরিতে বিদ্যুৎ বিভাগের নিচথেকে উপর পর্যন্ত বহু স্তর জড়িত।

১১. এলপিজির দাম মানুষের সাধ্যের মধ্যে ফিরিয়ে আনুন। বিদ্যমান মনোপলি ভাঙতে নতুন প্লেয়ার আনুন। বাসাবাড়ির চুরিবান্ধব গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার মাইগ্রেশন টার্গেট নির্ধারণ করুন দীর্ঘমেয়াদি (রোডম্যাপ, প্রান্তিকভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রাসহ)।

১২. আমাদের মাত্র দুটি FSRU, দুটিই মহেশখালীতে, এটা অপর্যাপ্ত। ৩য় ও ৪র্থ এলএনজি টার্মানাল স্থাপনা করুন। পছন্দের পক্ষ খুঁজতে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করুন।

১৩. সাগরে অনুসন্ধানে পিএসসি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আনুন। কোরিয়ান পস্কোসহ দীর্ঘ সিদ্ধান্তহীনতায় যারা চলে গেছে, তাদের ফেরাতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনায় বসুন। এ কাজে অভিজ্ঞ ট্রেড নেগোশিয়েটর নিয়োগ দিন, অনভিজ্ঞ কোনও কমিটির পরামর্শে নয়।

১৪. বাপেক্সকে বিনিয়োগ দিন, কিন্তু বাস্তববাদী হোন। প্রযুক্তি ও গবেষণার ঘাটতি বাপেক্স একা পূরণ করতে পারবে না। রিজার্ভার ম্যানেজমেন্ট, এক্সপ্লোরেশন ও ডেভেলপমেন্ট কূপ খননে সক্ষম বিদেশি অংশীদার আনুন।

১৫. সোলারকে ডেমোক্রেটাইজ করুন। ব্যক্তি উদ্যোক্তা ও ভোক্তা নির্ভর করেদিন। প্যানেল, কনভার্টার, ব্যাটারি ও অ্যাপ্লায়েন্সের শুল্ক শূন্যে আনুন, সোলার হোম, মিনি, মিডি, লার্জ সব পর্যায়ে। বড় ব্যবসায়ীদের তোষণ করে হাউসহোল্ড সোলারের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক রাখবেন না।নতুন সংযোগের একটি বড় অংশ সোলারকেন্দ্রিক করুন, নেট মিটারিংও ফিড-ইন কাঠামো স্পষ্ট করুন, নির্দিষ্ট আয়তনের বেশি বাণিজ্যিক ওশিল্পভবনের ছাদে সোলার বাধ্যতামূলক করুন। এই কাজে বাংলাদেশ অন্তত দশ বছর পিছিয়ে আছে। ২০৩০ এর মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান করুন।

পোস্টের শেষে নাহিদ বলেন, ‘জ্বালানি খাত জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখানে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দেয় কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ছোট ব্যবসায়ী, যারা কোনো কমিশন পান না। সরকারের প্রথম দায় জনগণের প্রতি, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতি নয়। এই সহজ কথাটি পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার ভুলে গিয়েছিল। বিএনপি সরকারও ভুলে যাওয়ার পথে। মাফিয়া তোষণের মূল্য বাংলাদেশ একবার দিয়েছে, আর নয়। এবারের ভুল, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের নীতি এনসিপি রুখে দাঁড়াবে।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন