

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী যখন নির্দিষ্ট এক সরলরেখায় চলে আসে, তখন চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে। সেই সময়ই ঘটে সূর্যগ্রহণ। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের মুহূর্তে দিনের আলো হঠাৎ কমে গিয়ে আকাশে তৈরি হয় অদ্ভুত এক আবহ। সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি আড়াল হয়ে গেলে তখন দেখা দিতে পারে তার বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা।
তবে সূর্যগ্রহণ শুধু দৃষ্টিনন্দন একটি মহাজাগতিক ঘটনা নয়। সূর্যের বায়ুমণ্ডল, সৌরবায়ু ও মহাকাশের নানা প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণকে ঘিরে জেনে নেওয়া যাক এ ঘটনা সম্পর্কে ১১টি তথ্য।
১. সূর্যগ্রহণ কীভাবে হয়?
চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করে এবং তার ছায়া পৃথিবীর কোনো অংশে পড়ে, তখন সূর্যগ্রহণ ঘটে। সূর্যের পুরো চাকতি চাঁদ ঢেকে ফেললে সেটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ, আর আংশিক ঢাকা পড়লে আংশিক সূর্যগ্রহণ।
২. চাঁদ ছোট হয়েও সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকে কেন?
আকারের দিক থেকে সূর্য চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড়। আবার পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বও চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বেশি। এই কাকতালীয় অনুপাতের কারণে পৃথিবী থেকে দুটিকে আকাশে প্রায় একই আকারের মনে হয়। ফলে বিশেষ পরিস্থিতিতে চাঁদ সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে ফেলতে পারে।
৩. সূর্যগ্রহণ এক ধরনের নয়
সূর্যগ্রহণ প্রধানত চার ধরনের—পূর্ণ, আংশিক, বলয়গ্রাস ও হাইব্রিড। বলয়গ্রাস গ্রহণের সময় চাঁদের আপাত আকার সূর্যের চেয়ে কিছুটা ছোট থাকায় সূর্যের চারপাশে উজ্জ্বল একটি বলয় দেখা যায়। এটি পরিচিত ‘রিং অব ফায়ার’ নামে। আর হাইব্রিড গ্রহণের ক্ষেত্রে পৃথিবীর একেক স্থান থেকে একই গ্রহণকে পূর্ণ বা বলয়গ্রাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।
৪. পূর্ণগ্রহণে দেখা যায় সূর্যের করোনা
সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের বাইরের বায়ুমণ্ডলকে করোনা বলা হয়। স্বাভাবিক সময়ে সূর্যের তীব্র আলোয় এটি দেখা যায় না। কিন্তু পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি ঢেকে দিলে চারপাশে সাদা আলোর মুকুটের মতো করোনার উপস্থিতি চোখে পড়ে।
৫. করোনার তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও বেশি
সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠ বা ফটোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিপরীতে করোনার তাপমাত্রা প্রায় ২০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল কেন পৃষ্ঠের তুলনায় এত বেশি উত্তপ্ত—এটি সৌরবিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য।
৬. দিনের বেলাতেই নেমে আসে অন্ধকার
পূর্ণগ্রহণের পথে থাকা অঞ্চলে চাঁদ সূর্যকে ঢেকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের আলো দ্রুত কমে যায়। পরিবেশ অনেকটা ভোর বা সন্ধ্যার মতো হয়ে উঠতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় তাপমাত্রাও কয়েক ডিগ্রি কমে যেতে পারে। তবে এর মাত্রা স্থান ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে।
৭. বদলে যেতে পারে প্রাণীদের আচরণ
হঠাৎ দিনের আলো কমে যাওয়ায় কিছু প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। পাখিরা বাসায় ফিরে যেতে পারে, আবার কিছু নিশাচর প্রাণী নির্ধারিত সময়ের আগেই সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। মূলত আলো ও পরিবেশের আকস্মিক পরিবর্তনই এর কারণ।
৮. পূর্ণগ্রহণের সময় আকাশে দেখা যেতে পারে গ্রহ-নক্ষত্র
পূর্ণগ্রহণের সময় আকাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় উজ্জ্বল কিছু নক্ষত্র ও গ্রহও চোখে পড়তে পারে। তবে ঠিক কোন জ্যোতিষ্ক দেখা যাবে, তা নির্ভর করে গ্রহণের সময়, স্থান ও আকাশে তাদের অবস্থানের ওপর।
৯. পূর্ণগ্রহণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না
একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে থাকার সময় খুবই কম। সাধারণত পূর্ণতার পর্যায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের ১২ আগস্টের গ্রহণেও অধিকাংশ এলাকায় পূর্ণগ্রহণের সময় দুই মিনিটের কম থাকবে।
১০. বিজ্ঞানীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সূর্যগ্রহণ
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ আড়াল হয়ে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা করোনার বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণের বিশেষ সুযোগ পান। এর মাধ্যমে সৌরবায়ু ও সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যায়। বহু বছর ধরে সূর্যগ্রহণের পর্যবেক্ষণ সৌরবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞানের গবেষণায় ভূমিকা রেখে আসছে।
সূর্যগ্রহণ দেখার সময় সতর্কতা
সূর্যগ্রহণ দেখার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখের নিরাপত্তা। খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো উচিত নয়। সাধারণ সানগ্লাসও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে চোখকে নিরাপদ রাখে না। তাই গ্রহণ পর্যবেক্ষণের জন্য অনুমোদিত সৌর পর্যবেক্ষণ চশমা বা নিরাপদ সৌর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ যখন সম্পূর্ণভাবে সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি ঢেকে দেয়, শুধু সেই অতি সংক্ষিপ্ত ‘পূর্ণতা’ পর্যায়েই সরাসরি দেখা নিরাপদ হতে পারে। পূর্ণতার আগে ও পরে অবশ্যই চোখের সুরক্ষা ব্যবহার করতে হবে।
প্রসঙ্গত, আজ (১২ আগস্ট) পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পূর্ণতার পথ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের একটি অংশের ওপর দিয়ে গেছে। উত্তর গোলার্ধের আরও বিস্তৃত এলাকায় এ গ্রহণ আংশিকভাবে দেখা যাচ্ছে।

