সোমবার
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার রূপলাল হাউস 

হাসিব সরদার, জবি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
পুরান ঢাকার রূপলাল হাউস 
expand
পুরান ঢাকার রূপলাল হাউস 

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক রূপলাল হাউস প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস বহন করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে নীরবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই স্থাপত্য নিদর্শনটি একসময় ছিল পুরান ঢাকার অভিজাত জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক আভিজাত্যের অন্যতম কেন্দ্র।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮২৫ সালে আর্মেনীয় ব্যবসায়ী স্টিফেন আরাটুন ভবনটি নির্মাণ করেন, যা তখন ‘আরাটুন হাউস’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে বণিক রূপলাল দাস ও তার ভাই রঘুনাথ দাস ভবনটি ক্রয় করে নতুনভাবে এর রূপান্তর ঘটান। এরপর কলকাতার বিখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান মার্টিন কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ভবনটির পুনর্নির্মাণ করা হয়, যা এটিকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলে।

১৮৮৬ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে এখানে আয়োজিত এক বল ডান্স পার্টির মাধ্যমে রূপলাল হাউস ব্যাপক আলোচনায় আসে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এটি ছিল ঢাকার অন্যতম আভিজাত্যপূর্ণ অট্টালিকা, যা একসময় আহসান মঞ্জিল-এর সমমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচিত হতো।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে ভবনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই তলা বিশিষ্ট এই ভবনটি দুটি অসম ব্লকে বিভক্ত এবং এর ভূমি নকশা ইংরেজি ‘E’ অক্ষরের অনুকরণে নির্মিত। ভবনের দীর্ঘ নদীমুখী বারান্দা, গ্রীক ডোরিক ও সেমি-করিন্থিয়ান স্তম্ভ, খিলানযুক্ত জানালা এবং রেনেসাঁ স্থাপত্যের উপাদান একে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। একসময় উপরের তলায় ছিল সুসজ্জিত নাচঘর, যেখানে কাঠের মেঝে ও নান্দনিক সাজসজ্জায় অভিজাতদের সামাজিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো।

ঐতিহাসিক বাকল্যান্ড বাঁধের পাশেই অবস্থান হওয়ায় এই ভবনটি পুরান ঢাকার নগর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। একসময় এটি ছিল ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদারদের বাসস্থান এবং সামাজিক আড্ডার কেন্দ্র।

তবে সময়ের পরিবর্তনে রূপলাল হাউস-এর সেই জৌলুস আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন অংশে মসলার আড়ত, সবজি বিক্রেতা এবং অবৈধ দখলদারদের বসতি গড়ে উঠেছে। স্থাপনার কাঠামোও অনেক জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তালিকায় থাকলেও ভবনটির পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয়রা বলছেন, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে পুরান ঢাকার এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পুরান ঢাকার নগর ইতিহাস, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য এবং সামাজিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে রূপলাল হাউস আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গার তীরে সময় ও অবহেলার ভার বয়ে।

এখানের এক দর্শনার্থী রাকিব বলেন, রূপলাল হাউসে ঢুকলেই মনে হয় যেন পুরান ঢাকার কয়েকশ বছরের ইতিহাস চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এর প্রতিটি দেয়াল আর নকশার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম ঐতিহ্যের গল্প।

আরেক দর্শনার্থী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, এই স্থাপনা শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, এটি পুরান ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক আকর্ষণ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন