

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল মেয়ে দেশের নামী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। অসুস্থ বাবারও শেষ ভরসা এই বড় মেয়েটিই। অভাব আর অনটনের সংসারে নিজের বলতে ছিল কেবল এক বুক স্বপ্ন আর এক আকাশ জেদ। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই স্বপ্ন থমকে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোহার গেটে, মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) গুচ্ছভুক্ত ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) কেন্দ্রে এসেছিলেন চট্টগ্রামের চন্দনাইশের আমিনা সুলতানা চৌধুরী। কিন্তু যানজট আর জীবনের জটিল সমীকরণ মিলিয়ে দিতে গিয়ে তিনি কেন্দ্রে পৌঁছান নির্ধারিত সময়ের ঠিক আধ ঘণ্টা পর। নিয়ম আর শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে কেন্দ্রের দরজা তার জন্য আর খোলেনি।
আমিনার জীবনটা অন্য পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়। কয়েক বছর আগে মাকে হারানোর পর থেকেই সংসার নামের কঠিন যুদ্ধের হাল ধরতে হয়েছে তাকেই। বড় ভাই না থাকায় তিনিই পরিবারের অভিভাবক।অসুস্থ বাবার দেখভাল, রান্নাবান্না, সবকিছু সামলাতে হয় একা হাতে।
গত নভেম্বর থেকে তার বাবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাবার শয্যার পাশে বসেই কেটেছে তার দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। সেবার ফাঁকে ফাঁকেই বই খুলে বসেছেন আমিনা। কারণ থেমে থাকলে চলবে না, লড়াইটা তার নিজের ভবিষ্যতেরও।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যেই তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জন্য। একদিকে বাবার সেবা, অন্যদিকে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম।
পরীক্ষার আগের দিন সবাই যখন কেন্দ্রে আশেপাশে নিরাপদ আশ্রয়ে, আমিনা তখন ব্যস্ত ছিলেন অসুস্থ বাবার ওষুধের খোঁজে। সকালে রওনা দিলেও পথিমধ্যে তীব্র যানজট তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ঘড়ির কাঁটা যখন বেলা ১১টা পার করে ৩০ মিনিটের ঘরে, আমিনা তখন কেন্দ্রের গেটে। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা স্রেফ জানিয়ে দিলেন—'দেরি হয়ে গেছে'।
কান্নায় ভেঙে পড়া আমিনা গেট আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে বলছিলেন, “এটাই ছিল আমার শেষ চেষ্টা। আমার মা নেই, বাবা অসুস্থ। আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। একটা সুযোগ কি পেতে পারি না?”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য জানান, ৫-১০ মিনিট হলে হয়তো বিবেচনা করা যেত, কিন্তু আধা ঘণ্টা পর কাউকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া নিয়মের পরিপন্থী।
প্রশাসনের এই 'লোহার নিয়ম' হয়তো ঠিক ছিল, কিন্তু সেই নিয়মের তলায় চাপা পড়ে গেল এক অদম্য জীবনসংগ্রামীর ভবিষ্যৎ। আমিনা চলে গেছেন গেট ছেড়ে, কিন্তু পেছনে রেখে গেছেন একরাশ দীর্ঘশ্বাস। তার কান্নায় সিক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধুলোবালিও।
মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়েকে বিদ্যাপীঠের আঙিনায় দেখার। মা নেই, সেই স্বপ্ন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ গেটের ওপাশে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। অসুস্থ বাবার কাছে গিয়ে আমিনা আজ কী জবাব দেবেন? সেই প্রশ্ন এখন চন্দনাইশের আকাশ-বাতাসে।
আমিনার এই লড়াই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, শুধু মেধা থাকলেই চলে না, ভাগ্য এবং পরিস্থিতির আনুকূল্যও বড় প্রয়োজন। নিয়ম যেখানে মানুষের স্বপ্নকে পিষে ফেলে, সেখানে মানবিকতা হার মানে কি বারবার?
মন্তব্য করুন