

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধাবসানের লক্ষ্যে একটি শান্তিচুক্তির আশা জাগায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ার বাজারে। সেখানে সূচকের বড় উত্থান লক্ষ্য করা গেছে ।
এদিকে বিশ্ববাজারে দাম কমার দিনই ভারতে বাড়ল তেলের দাম। সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে আন্তর্জাতিক তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম পাঁচ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৮ দশমিক ৩৬ ডলারে নেমে এসেছে ।
অন্যদিকে, মার্কিন অপরিশোধিত তেল বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৫ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯১ দশমিক ৫০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। লেনদেনের শুরুর দিকে উভয় গত ৭ মে-এর পর তাদের সর্বনিম্ন মূল্য স্পর্শ করে । যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ছুটি থাকায় সোমবার সেখানকার জ্বালানি ও আর্থিক বাজার বন্ধ রয়েছে ।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাম্প জানান, তিনি সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের নেতাদের সঙ্গে ‘শান্তি সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক’ নিয়ে ‘খুব ভালো আলোচনা' করেছেন । তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা একটি চুক্তি নিয়ে বড় আকারে সমঝোতা হয়েছে। চুক্তির শেষ দিককার বিষয় ও খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা শিগগির ঘোষণা করা হবে। যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো।
তবে বেশ কিছু জটিল বিষয়ে দুই পক্ষ এখনো ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে । ট্রাম্প রবিবারও বলেন যে, তিনি তার প্রতিনিধিদের কোনো চুক্তির জন্য তাড়াহুড়ো না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আইএনজি-এর কমোডিটি স্ট্যাটেজির প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, আমরা আগেও এই পর্যায়ে এসেছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেস্তে গেছে। তাই বাজার সম্ভবত অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে এবার আরো বেশি সতর্ক থাকবে। হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে যাওয়ার আশায় জাপানের নিক্কেই ২২৫ শেয়ার সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৫ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছে। জ্বালানির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বাজার বিশ্লেষকেরা এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা এখনই উড়িয়ে দিচ্ছেন না। আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এমএসটি ফাইন্যান্সের জ্বালানি গবেষণা প্রধান সল কাভোনিক বলেন, 'সুড়ঙ্গের শেষে কিছুটা আলোর দেখা মিলেছে, যা সাময়িকভাবে তেলের বাজারে স্বস্তি দেবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলেও, হরমুজ প্রণালিতে তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক করা, ক্ষতিগস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত এবং যুদ্ধ শুরুর পর রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়া বৈশ্বিক তেলের মজুত আবার গড়ে তুলতে সময় লাগবে। ফলে ২০২৭ সাল পর্যন্ত তেলের বাজারে এই টানাপড়েন বজায় থাকবে ।
এদিকে একদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন নাটকীয়ভাবে কমছে, তখন ঠিক উলটো চিত্র দেখা গেলো প্রতিবেশী দেশ ভারতে । ইরান যুদ্ধের আবহে গত ১১ দিনে চতুর্থবারের মতো দেশটিতে বাড়ল পেট্রোল ও ডিজেলের দাম । সোমবার নতুন করে লিটারপ্রতি তেলের দাম বেড়েছে দুই রুপিরও বেশি । এর ফলে রাজধানী নয়াদিল্লিতে পেট্রোলের দাম সেঞ্চুরি পার করে ১০২ রুপি ছাড়িয়েছে। সোমবার ভারতে লিটারপ্রতি পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২ রুপি ৬১ পয়সা এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে ২ রুপি ৭১ পয়সা। এর আগে, গত শনিবারও দেশটিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয় । ভারতে জ্বালানি তেলের এমন দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি আগে থেকেই মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্য পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। এর আগের দফায় দাম বাড়ার কারণে বাজারে এরই মধ্যে দুধ এবং পাউরুটির দাম বেড়ে গেছে।
চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এতদিন চড়া ছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ দুই মাস ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনলেও ভারতের বাজারে পুরোনো দামেই বিক্রি করছিল। কিন্তু এই বিপুল লোকসান সংস্থাগুলোর জন্য এখন আর সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই।
হিসাব অনুযায়ী, এই তিন সংস্থা মিলে প্রতিদিন এক হাজার কোটি রুপির বেশি লোকসান গুনছিল। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়েই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ভারতে ২০২২ সালের এপ্রিলের পর তেলের দাম দীর্ঘদিন স্থিতিশীল ছিল। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে লিটারপ্রতি দুই রুপি কমানো হয়েছিল । কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটি বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই দফায় দফায় দাম বাড়াতে শুরু করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ট থর্নটন ভারতের তেল ও গ্যাস খাতের অংশীদার সৌরভ মিত্রের মতে, ভবিষ্যতে হয়তো বাজার সামাল দিতে দাম আবারও সমন্বয় করতে হতে পারে। তবে সরকারকে অবশ্যই তেল সংস্থাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার ওপর এর প্রভাবের বিষয়টিও ভারসাম্যপূর্ণভাবে বিবেচনা করতে হবে।